প্রকাশিত : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ১০:০৫:৫৭
ব্যাপক আয়োজন-আড়ম্বরতার মধ্যদিয়ে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কি নেই সেই আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে—সকালের নাস্তা, রাতের খাবার। প্রশ্ন জাগতে পারে, হঠাৎ করেই কি বিন সালমানকে বেশ খাতির যত্ন করছেন? না, প্রথম মেয়াদেও বিন সালমানের সঙ্গে বেশ সখ্য ছিল ট্রাম্পের। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্পের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে, বিশ্বব্যাপী যখন মার্কিন কূটনীতি নানামুখি চাপে, তখন সৌদির মতো তেল-সমৃদ্ধ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করাতো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই জরুরি।
ট্রাম্প না হয় বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমশ একা হয়ে পড়া, নিজেদের বলয়ে আধিপত্য কিছু কমে যাওয়ার কারণে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রকে মেক গ্রেট অ্যাগেইনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু উপসাগরীয় সৌদি কেন উতলা হয়ে উঠল যুক্তরাষ্ট্রে জন্য। হঠাৎ বিনিয়োগ ৬০০ বিলিয়ন থেকে এক ট্রিলিয়ন করার সিদ্ধান্ত নিল। একমাত্র ইসরায়েল ছাড়া যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান উপসাগরীয় আর কোনো দেশের নেই, সেই বিমান কিনতে উঠেপড়ে লাগল। অ্যারাবিয়ান হর্স কেন হাতে চায় মার্কিন বাজপাখি। মরুর বেদুঈন কেন গড়ছে কাউবয়ের সঙ্গে জিগরি দোস্তি। শুধু কি সামরিক শক্তি বৃদ্ধি না এর পেছনে আরও কোনো গভীর কারণ রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বলেছেন, বৈঠকের চেয়ে আমাদের বেশি কিছু হবে। আমরা সৌদি আরবকে, যুবরাজকে সম্মান জানাচ্ছি।
বিন সালমান যে যুক্তরাষ্ট্রের কত বড় অতিথি তা হোয়াইট হাউসের কর্মকাণ্ডেই বোঝা যায়। এই সফরকে সরকারি রাষ্ট্রীয় সফর বলা যায় না, কারণ যুবরাজ বিন সালমান সৌদি আরবের রাষ্ট্রপ্রধান নন। এই পদটি তার ৮৯ বছর বয়সি বাবা বাদশাহ সালমান দখল করেছেন। কিন্তু যুবরাজ প্রায় পুরো দেশ শাসনের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশের নেতা হিসেবে শীর্ষ সম্মেলন এবং অন্যান্য কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দেন।
সাত বছর আগে হোয়াইট হাউস সফর করেছিলেন বিন সালমান। তখনই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সৌদির কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করবে। যদিও ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিতর্কিত মনে করা হয়, কারণ তা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, ‘তারা আমাদের বড় মিত্র। আমি বলব, আমরা তা করব। আমরা এফ-৩৫ বিমান বিক্রি করব।’
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে ইসরায়েল দৃশ্যত নাখোশ। কিন্তু এই নাখোশ ঠিক কতটা মন থেকে, আর কতটা লোকদেখানো তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। কারণ, ট্রাম্প যে শুধু বিমানই বিক্রি করছেন তা নয়, পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদির কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আব্রাহাম অ্যাক্রডে যুক্ত করতেও চেষ্টা করছেন। যদি সেটা হয় তবে তা ট্রাম্পের বড় কূটনৈতিক সফলতা হবে।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘বৈঠকে আব্রাহাম অ্যাক্রডসও আলোচনার অংশ হবে। আমি আশা করি সৌদি খুব শিগগিরই এই চুক্তিতে আসবে।
আর এ জন্য ট্রাম্প আব্রাহাম অ্যাক্রডের অন্যতম কুশীলব জামাতা জ্যারেড কুশনারকেও বিন সালমানের পেছনে লাগিয়ে রেখেছেন। গত সপ্তাহেও কুশনার রিয়াদ সফর করেছেন এবং সৌদি যুবরাজের সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা করেছেন। সৌদি যুবরাজের সঙ্গে কুশনারের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাও রয়েছে। আব্রাহাম অ্যাক্রডে বিন সালমানকে রাজি করাতে এই সম্পর্ককেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন কুশনার।
এসবের বাইরেও ট্রাম্পের ব্যক্তি আর্থিক লাভের ব্যাপার আছে সৌদি যুবরাজ ও এই অঞ্চল ঘিরে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং এরিক ট্রাম্প সৌদি আরবে আবাসন ব্যবসায় বড় ধরনের বিনিয়োগ আছে। কুশনারেরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক মিত্রতা আছে সৌদির সঙ্গে। কুশনারের বিনিয়োগ তহবিল অ্যাফিনিটি পার্টনারস সৌদি আরব থেকে কোটি কোটি ডলার মূলধন সংগ্রহ করেছে।
এই তো গেল ট্রাম্পের দিক থেকে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত লাভ-অলাভের হিসাব। কিন্তু সৌদি যুবরাজ কেন এত বেশি ঝুঁকছেন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে? সেজন্য নিকট অতীতে চোখ ফেলতে হবে। সৌদি যুবরাজ সর্বশেষ ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন ২০১৮ সালে, সৌদি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডের এক মাস আগে। খাসোগিকে তুরস্কস্থ সৌদি কনস্যুলেটে হত্যা করা হয়েছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র মূল্যায়ন হলো, সৌদি যুবরাজ হয়তো এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়ে থাকতে পারেন। যদিও বিন সালমান বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছেন।
মজার ব্যাপার হলো সিআইএ’র এমন মূল্যায়নের পরও ট্রাম্প কখনো সৌদি যুবরাজের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করেননি। যদিও ওই ঘটনার পর বিন সালমানকে তিনি আর প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানাননি। এমনকি ট্রাম্পের পর জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ‘একঘরে’ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। যদিও পরে তিনিও ক্ষমতায় থাকাকালীন রিয়াদ সফর করেছিলেন এবং যুবরাজ বিন সালমানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।
খাসোগি হত্যার পর বিন সালমানের ভাবমূর্তির ব্যাপক ক্ষুণ্ন হয়। শুধু পশ্চিমা বিশ্বে নয়, মুসলিম বিশ্বেও তখন বিন সালমানের ভাবমূর্তিতে ধস নেমেছিল। বিন সালমান এখন দেদারছে অর্থকড়ি খরচ করে সেই হারানো ভাবমূর্তি উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। পশ্চিমের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের হারানো মুরুব্বির গৌরবও ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাই নানান চুক্তির পাশাপাশি সামরিক চুক্তিও করছেন। কিনছেন সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-৩৫-ও। সৌদির অনেক দিনের চাওয়া এই যুদ্ধবিমান। মার্কিন কংগ্রেস হয়তো সৌদিকে এই বিমান দিতে বাধাও তৈরি করবে। তবে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, সৌদিকে এই বিমান দেবেন।
সৌদি যুবরাজের এই সফরে ওয়াশিংটনে একটি বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা অংশ নেবেন। গত মে মাসে সৌদি সফর করেছিলেন ট্রাম্প। ওই সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০ বিলিয়ন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন যুবরাজ বলছেন, ৬০০ বিলিয়নের জায়গায় এক ট্রিলিয়ন বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন।
এছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে একটি মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের বিনিময়ে একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার ব্যাপারে আলোচনা হওয়ার কথা। কারণ গাজা যুদ্ধের কারণে মাঝে এসব থমকে ছিল। এখন ট্রাম্পের প্রচেষ্টায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে। ট্রাম্পের আশা, ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে সৌদি এখন রাজি হবে এবং অন্যরাও রাজি হবে।
তবে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি হলেও তা কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন আছে। এটা একটা বড় বাধা। হয়তো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে এফ-৩৫ বিমান পাওয়ার চেষ্টা করছেন বিন সালমান।
এদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সৌদি এক শর্তের কথা বলেছে। দেশটির কথা, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের জন্য ইসরায়েলকে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য’ এবং ‘দৃঢ়’ রূপরেখা থাকতে হবে। এছাড়া, সৌদি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে রেখেছে। আর তা হলো—সুদানে স্থিতিশীলতা। কারণ সুদানের অস্থিতিশীলতা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য জরুরি মনে করে সৌদি। দেশটির বিশ্বাস, ট্রাম্প বাইরে থেকে সহযোগিতা করলে সুদানের গৃহযুদ্ধ থামানো সম্ভব। সবকিছু যে বিন সালমানের এই সফরেই ঘটবে তা আপাতত বলা যাচ্ছে না। যদিও সৌদি যুবরাজ দুই হাত খুলে অর্থ ঢালছেন।