বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভেতরে অর্থ নিয়ে অনিয়মের গল্প নতুন নয়। তবে এবার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা অনেককেই বিস্মিত করেছে। মাঠ পরিষ্কার রাখা যাদের দায়িত্ব সেই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পারিশ্রমিক থেকেই কাটা পড়ছে বড় অংশ, আর সেই বিষয়টি সামনে এনেছেন বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবাল নিজেই।
বিসিবি থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দৈনিক ৬৫০ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে মাত্র ৩০০ টাকা। বিষয়টি প্রথম জানতে পেরে বিস্ময় লুকাতে পারেননি তামিম। তিনি বলেন, ‘এটা (ক্লিনারদের পারিশ্রমিক) শুনে খুব অবাক হয়েছি।
স্টেডিয়ামের অবকাঠামো নিয়েও উঠে এসেছে অবহেলার চিত্র। এক দর্শকের মন্তব্য থেকেই বিষয়টি গুরুত্ব পান তামিম। তিনি বলেন, ‘যেদিন গ্যালারিতে গেলাম, ফিনল্যান্ড থেকে সেদিন একজন মহিলা সকালেই এসে সোজা মাঠে খেলা দেখতে আসে। তিনি আমাকে খুব সুন্দর করে এসে বললেন যে, ভাইয়া যদি একটু ওয়াশরুমগুলো ঠিক করা যায়। হয়তো শুনে অবাকই হবেন যে স্টেডিয়াম যখন নির্মাণ হয়েছিল, তারপর থেকে আর বাথরুম নিয়ে কোনো সংস্কার হয়নি। যা একদমই ঠিক হয়নি।’
এরপরই সামনে আসে আরও অস্বস্তিকর বাস্তবতা। মাঠের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে থাকা এক কর্মীর কাছ থেকেই সরাসরি বিষয়টি শোনেন তিনি। তামিম বলেন, ‘তো সেদিন আমি যাওয়ার সময় ওখানে বাথরুমটা পরিষ্কার রাখার দায়িত্বে থাকা একজন... আমি তাকে খালাম্মা ডাকি... তিনি বলেছিলেন, আমাদের দিনে ৩০০ টাকা করে দেওয়া হয়। ভিডিওতে অনেকেই হয়তো দেখেছেন। তো খালাম্মা আমাকে বললেন, এই জিনিসটা যেন আমি একটু দেখি।’
খোঁজ নিয়ে তামিম জানতে পারেন, পুরো প্রক্রিয়াটির পেছনে রয়েছে তৃতীয় পক্ষের একটি কোম্পানি। বিসিবির পক্ষ থেকে নির্ধারিত টাকা ওই কোম্পানির মাধ্যমে দেওয়া হলেও, মাঝপথেই বড় একটি অংশ কেটে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘জিনিসটা আসলেই খুব শকিং। এই জিনিসগুলাও যে বিসিবিতে হয় আইডিয়া ছিল, কিন্তু এই লেভেলে হয়, সেটার আইডিয়া ছিল না। বিষয়টি হলো, বিসিবির নিজস্ব ক্লিনার আছে। কিন্তু যখন সিরিজ চলে তখন বিসিবি থার্ড পার্টি থেকে ক্লিনিংয়ের সুবিধা নেয়। নিয়মানুযায়ী, টেন্ডারে কাজ পাওয়া সেই কম্পানি লোকজন দেবে। কিন্তু এখন যা হচ্ছে, সেই কম্পানি বিসিবির ৩০-৪০ জন ক্লিনার দিচ্ছে। বিসিবির থেকে সেই কম্পানি টাকাটা নিয়ে বিসিবির লোকজনকেই দিচ্ছে। ওই কম্পানি নিজেদের মতো করেই ক্লিনারদের টাকা দিচ্ছে। আর যা প্রফিট আসছে, তা রেখে দিচ্ছে!’
ঘটনাটি নিয়ে সরাসরি কোম্পানির সঙ্গে কথাও বলেছেন তামিম। সেখানেও উঠে এসেছে টাকার অস্বচ্ছ লেনদেনের চিত্র। তিনি বলেন, ‘আমি কম্পানির লোককে বললাম, আপনারা সাড়ে ছয় শত টাকা থেকে দেড় শ টাকা নিতে পারেন। এই মহিলারা তো অন্তত পাঁচ শ টাকা পেতে পারে। তখন কম্পানির লোক বলল, ভাই, আমি পাঁচশ টাকা করেই দিই। কাকে দেন? বললে প্রতিউত্তরে সে বলল, বিসিবির ওই ওমুককে দিই। মানে কয়েক হাত ঘুরে সেই টাকা ক্লিনারদের কাছে আসে!’
এই অনিয়ম বন্ধে ইতোমধ্যেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে যেন সরাসরি কর্মীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা দেওয়া হয়, সেই নির্দেশ দিয়েছেন তামিম। তিনি বলেন, “আমি সেই কম্পানিকে বললাম, ‘এখন থেকে ক্লিনার আপনাদের সরবরাহ করতে হবে। ক্লিনারদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করে দেবেন। সেই অ্যাকাউন্টে টাকা গিয়েছে; এমন প্রমাণসহ আপনি বিল সাবমিট করবেন। না হলে আমি বিল ছাড়ব না। এসব দুর্নীতির অনেক কিছুই তো আপনারা জানেন। আমার কষ্ট হয়, যে মহিলারা দৈনিক তিন শ-চার শ টাকা উপার্জন করে, এদের থেকেও টাকা খেতে হবে? এদের থেকেও টাকা চুরি করতে হবে? অ্যাবসুলিউটলি ননসেন্স! আমি বলেছি, এই সিরিজে ৩০ জন মহিলাকে ডাকবেন। আমার সামনে তাদের পাঁচ শ টাকা করে দেবেন।”