দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ। বহুদিনের জমে থাকা উত্তেজনা এবার বিস্ফোরিত হয়েছে সরাসরি সামরিক সংঘাতে। পাকিস্তান আর রাখঢাক না রেখে আফগানিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—এটি আর ছায়াযুদ্ধ নয়, বরং প্রকাশ্য শক্তির প্রদর্শন।
এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে একটি নাম—তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে এই গোষ্ঠী পাকিস্তানে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে হামলা, সেনা হতাহত এবং নিরাপত্তা অস্থিতিশীলতার পর পাকিস্তান এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরাসরি আঘাত হানার। তাদের ভাষায়, ‘ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছে পরিস্থিতি।’
আবারও জ্বলছে ডুরান্ড লাইন। ২৬৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তে কামানের গর্জন, রকেটের বিস্ফোরণ আর যুদ্ধবিমানের শব্দ—দক্ষিণ এশিয়াকে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত সংঘাতের দিকে।
অপারেশন ‘গাজাব লিল-হক’ নামে পাকিস্তানের এই অভিযান কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং কৌশলগত বার্তা। কাবুলের উপকণ্ঠসহ বিভিন্ন প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তান দেখাতে চেয়েছে—প্রয়োজনে তারা সীমান্তের ভেতরে ঢুকেও হামলা করতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে আফগান তালেবান প্রশাসন এই হামলাকে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। তারা টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। একইসঙ্গে তারা প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। তবে সামরিক বাস্তবতায় দুই দেশের শক্তির পার্থক্য স্পষ্ট। পাকিস্তানের শক্তিশালী বিমান বাহিনী এবং প্রথাগত যুদ্ধক্ষমতার বিপরীতে তালেবানদের প্রধান শক্তি গেরিলা কৌশল। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো তালেবানদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তাই তারা অপ্রচলিত হামলার পথ বেছে নিতে পারে।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক কূটনীতি। চীন, তুরস্ক, কাতার, সৌদি আরব, ইরান এবং রাশিয়া—সবাই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে। কারণ এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় পড়বে।
প্রশ্ন হলো—এই সংঘাত কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে, নাকি কূটনীতির টেবিলে সমাধান হবে? পাকিস্তান দেখাতে চায় তার নিরাপত্তা নিয়ে আপস করবে না। আর আফগানিস্তানও নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পিছিয়ে যেতে নারাজ।
দুই দেশের সীমান্তে এখন শুধু গোলাগুলিই চলছে না—চলছে শক্তি, মর্যাদা এবং কৌশলগত আধিপত্যের লড়াই। আর এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা।
সবকিছুর শুরু ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে। আফগানিস্তানের নঙ্গরহার ও পকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলা নতুন করে আগুন জ্বালায়। এরপর কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় সীমান্ত সংঘর্ষ, আর বৃহস্পতিবার রাত থেকে তা রূপ নেয় সম্মুখসমরে। পাকিস্তান এই অভিযানের নাম দিয়েছে—‘অপারেশন গাজাব লিল হক’। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এটি আর সীমিত অভিযান নয়—এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ।
এই যুদ্ধের পেছনে মূল কারণ নিরাপত্তা উদ্বেগ। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় নিয়ে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তান মনে করছে, সীমান্তের ওপারে থাকা এই গোষ্ঠীগুলো তাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। তাই তারা সীমান্তের ভেতরে ঢুকে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সামরিক শক্তির হিসেবে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, পাকিস্তান বিশ্বের ১৪তম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, আর আফগানিস্তানের অবস্থান ১২১তম। পাকিস্তানের হাতে রয়েছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি এবং শক্তিশালী বিমান বাহিনী।
কিন্তু এই যুদ্ধের আসল শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়—ভূগোলে। আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ ও সুলেমান পর্বতমালার দুর্গম পাহাড়, প্রাকৃতিক গুহা এবং উঁচু অবস্থান তালেবানদের বড় সুবিধা দিচ্ছে। এই পাহাড়গুলো প্রাকৃতিক বাঙ্কারের মতো কাজ করে, যেখানে বিমান হামলার প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।
ইতিহাসও একই কথা বলে। ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র—তিনটি পরাশক্তিই আফগানিস্তানে সামরিকভাবে সফল হতে পারেনি। কারণ এটি একটি “অসম যুদ্ধ”—যেখানে দুর্বল পক্ষ সরাসরি যুদ্ধ না করে গেরিলা কৌশল, ভৌগোলিক সুবিধা এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের মাধ্যমে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে।
২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবানদের হাতে এসেছে বিপুল আধুনিক অস্ত্র। সেই সঙ্গে পাহাড়ের উঁচু অবস্থান থেকে তারা পাকিস্তানের রসদ সরবরাহ এবং সেনা চলাচল লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে।
এখন পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কি শুধু বিমান হামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি স্থল অভিযান শুরু করবে? কারণ স্থল অভিযান মানেই দীর্ঘ যুদ্ধ, আর সেই যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেশি।
ডুরান্ড লাইনের এই সংঘাত তাই শুধু সীমান্তের লড়াই নয়—এটি শক্তি বনাম অবস্থান, প্রযুক্তি বনাম ভূগোল, আর আধুনিক সেনাবাহিনী বনাম গেরিলা কৌশলের এক বিপজ্জনক সংঘর্ষ।
লেখক: সাংবাদিক