বিশ্বের নজর যখন ইরান যুদ্ধের দিকে, তখন নীরবে গাজায় অবরোধ আরও জোরদার করেছে ইসরায়েল। ফলে পণ্য ও মানবিক সহায়তার প্রবাহ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। ঈদুল ফিতরের মতো আনন্দঘন সময়েও গাজায় লাখো মানুষ তীব্র সংকট ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যে সময়টি হওয়া উচিত ছিল উৎসব ও পারিবারিক মিলনের, তা এখন পরিণত হয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়।
গাজার বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট শুধুমাত্র সাধারণ মূল্যস্ফীতি বা সাময়িক পণ্যের ঘাটতি নয়, হয়ে উঠেছে ইসরায়েলি দখল, স্থানীয় বাজারের অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কৌশলের জটিল সমন্বয়ের ফল। ইরান বা লেবাননকে ঘিরে উত্তেজনার মতো বাইরের ঘটনাকে ইসরায়েল বারবার ব্যবহার করছে গাজায় পণ্য প্রবেশের পথ সীমিত করার অজুহাত হিসেবে, পাশাপাশি সামরিক চাপও বাড়াচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। দ্রুত বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও সংকট।
বাজারে কিছু পণ্য পাওয়া গেলেও, অনেক ব্যবসায়ী এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, আগে যে টমেটোর দাম ছিল ৩ শেকেল, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ শেকেল। একইভাবে বেড়েছে ক্যানজাত খাদ্যের দাম। রান্নার গ্যাসের মূল্য ৮ কেজির সিলিন্ডারের জন্য এখন ৮০ শেকেল, ফলে একটি পরিবারের মাসে প্রায় ৬৪০ শেকেল ব্যয় করতে হচ্ছে শুধু গ্যাসের জন্য। বিদ্যুতের দামও ১৮ শেকেল থেকে বেড়ে ২৫ শেকেল হয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির তালিকা এখানেই শেষ নয়। মাংস এখন অনেকের নাগালের বাইরে, প্রয়োজনীয় ওষুধও পাওয়া যাচ্ছে না সাশ্রয়ী দামে। ফলে ঈদের মতো উৎসবের সাধারণ আনন্দগুলোও হারিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে কিছু ব্যবসায়ীর অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা মানুষের মধ্যে অন্যায় ও ক্ষোভের অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
চলমান যুদ্ধ, বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং বহির্বিশ্বের সংঘাতকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ইসরায়েল গাজার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে। ‘গাজা থেকে নিরাপত্তা হুমকি’র পুরোনো যুক্তিকে সামনে রেখে সীমান্তপথ বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে গাজা ক্রমেই বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে জড়িয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে গাজায় ঈদুল ফিতর এখন দুঃসহ বাস্তবতার প্রতীক। অনেক পরিবারকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনবেন, নাকি ঈদের সামান্য আনন্দ উপভোগ করবেন। মাংস, সবজি ও গ্যাস এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ সংগ্রাম করছেন শুধুমাত্র দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে।
সরবরাহ থাকলেও পণ্যের একচেটিয়াকরণ ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি স্থানীয় বাজারকে আরও দুর্বল করে তুলছে। অবরোধের কারণে বাজার স্থিতিশীল করার যে কোনো উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা কিছু ব্যবসায়ীর জন্য দ্রুত মুনাফার সুযোগ তৈরি করছে—আর এর বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
গাজার সংকট কেবল অর্থনৈতিক তা নয়, বরং দখল, অবরোধ, বাণিজ্যিক শোষণ এবং আন্তর্জাতিক নীতির জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন।
এক সময়ের আনন্দের প্রতীক ঈদুল ফিতর আজ গাজায় হারানো উৎসবের স্মারক। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একটি জরুরি আহ্বান, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, সাধারণ মানুষকে শোষণ থেকে রক্ষা করা এবং মানবিক বিপর্যয়কে মুনাফার সুযোগে পরিণত হওয়া থেকে প্রতিরোধ করা।
লেখক
আমল আবু সাইফ
ফিলিস্তিনি লেখক ও গবেষক
লেখাটি আল জাজিরা থেকে অনূদিত