এ বছর ফসলের হিসাব মেলাতে গিয়ে কপালে দুচিন্তার ভাঁজ পড়ে রমেশ কুমারের। ভারতের উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরে নিজের গম ক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে ৪২ বছর বয়সী এই কৃষক মনে মনে হিসাব কষেন—সারের খরচ কত হলো; ফলন কেমন হতে পারে; বর্তমান বাজারদরই বা কত।
হিসাব করতে করতে তিনি মগ্ন হয়ে পড়েন আরও গভীর ভাবনায়—ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন, সংসারের খরচ, ঋণের কিস্তি, মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকা।
‘আমি জানি না, এ বছর আমরা মেয়ের বিয়ে দিতে পারব কি না। সবই নির্ভর করছে ফসলের ওপর,’ আল জাজিরাকে বলেন রমেশ।
অনিশ্চয়তা যেন খুব নীরবে এই কৃষক পরিবারের জীবনে জেঁকে বসেছে। সার, যা একসময় কৃষিকাজের জন্য খুব সহজলভ্য এবং নিয়মিত বিষয় ছিল, তা এখন হয়ে উঠেছে দুর্মূল্য। সময়মতো পাওয়াও দুষ্কর।
রমেশের কাছে এটি কেবল খরচের হিসাব নয়, সচ্ছল থাকা আর চরম সংকটে পড়ার মাঝের এক দেয়ালও।
তিনি বলেন, ‘যদি দাম আরও বাড়ে, তাহলে আমাদের অন্য কোথাও কাটছাঁট করতে হবে। হয়তো মেয়ের বিয়ে পিছিয়ে দিতে হবে। আর অবস্থা যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে বাচ্চাদের পড়াশোনা চালানোও কঠিন হয়ে পড়বে।’
রমেশের বড় ছেলে অমিতের (১২) স্কুলের বেতন সামনের সপ্তাহে দিতে হবে। পাশাপাশি ছোট মেয়ে বর্ষার ভবিষ্যতের বিয়ের জন্যও তাকে টাকা জমাতে হচ্ছে।
অবশ্য ভালো সময়েও এসব খরচ সামলানো সহজ নয়। রমেশ বলেন, ‘আমরা কোনোমতে চালিয়ে নিই। তবে এবার যদি ফলন ভালো না হয়, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে, কোনটাকে অগ্রাধিকার দেব আর কোনটা পিছিয়ে দেব।’
রমেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার লাখ লাখ কৃষকের কাছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ কেবল দূরদেশের ভূ-রাজনীতি নয়। এটি এখন তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্তগুলোকেও প্রভাবিত করছে।
দূরের সংকট, স্থানীয় প্রভাব
চলমান এই সংকটের মূলে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় সমতল থেকে এটি ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে অবস্থিত এক সংকীর্ণ নৌপথ। ইরান ও ওমানের মাঝখানের এই পথ পারস্য উপসাগর ও এর তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে উন্মুক্ত মহাসাগর এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরপরই তেহরান এই পথ বন্ধ করে দেয়। নাইট্রোজেনভিত্তিক সার তৈরির জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান এলএনজি বিপুল পরিমাণে এই পথ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে এশিয়ায় আসে।
এই পথে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটার অর্থ হলো, সারের জাহাজ পৌঁছাতে দেরি হওয়া, জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহে টান পড়া।
সারের সরবরাহে এই বিঘ্ন খুব দ্রুত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যায়, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যায়।
হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের এই ঝুঁকির আঁচ এখন দক্ষিণ এশিয়ায় অনুভূত হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়া প্রায় ২০০ কোটি মানুষের আবাসস্থল। গমের মতো প্রধান ফসল উৎপাদনের জন্য এই অঞ্চল ব্যাপকভাবে সারের ওপর নির্ভরশীল।
গত কয়েক দশকে সারের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার—যা ফসলের ফলন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়—এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমানে ভারতের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৬ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। পাকিস্তানে এই হার ৩৮ শতাংশ, বাংলাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং নেপালে ৬০ শতাংশের বেশি।
হরমুজ প্রণালির ওপর এই অঞ্চলের দেশগুলোর নির্ভরতার মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হলেও সবাই এই নৌপথ দিয়ে আসা সারের বাণিজ্যের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।
ভারত সরকারের তথ্য ও বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির কৃষিখাতের আকার ৪০০ বিলিয়ন ডলার। অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
সেখানে ১০০ কোটির বেশি কৃষক পরিবার সরাসরি কৃষির ওপর বেঁচে আছে। ভারত তার প্রয়োজনীয় সারের একটি বড় অংশ এবং কাঁচামাল (বিশেষ করে ফসফেট ও পটাশ) আমদানি করে। এর পাশাপাশি সার কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩০-৩৫ শতাংশ সরবরাহ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অথবা এই পথ ব্যবহারকারী দেশগুলো থেকে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে লাখ লাখ প্রান্তিক কৃষক আমদানিকৃত সারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।
সরকারি তথ্যমতে, দেশটির জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১২-১৩ শতাংশ। বাংলাদেশের কৃষিখাত আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট ও দামের ওঠানামার কাছে খুবই সংবেদনশীল। আমদানিকৃত সারের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা নৌপথের ওপর নির্ভরশীল।
ঝুঁকির মুখে জীবিকা
সামগ্রিকভাবে, পারস্য উপসাগরে সামান্যতম বিঘ্ন—এমনকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বাদ দিলেও—কোটি কোটি মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসতে পারে।
ভারত সরকার তার কৃষকদের আশ্বস্ত করে বলেছে, আপাতত সারের সরবরাহে ঘাটতি নেই।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ২৩ মার্চ পার্লামেন্টে বলেন, ‘আসন্ন গ্রীষ্মকালীন বপন মৌসুমের জন্য সারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকার তেল, গ্যাস এবং সার আমদানির ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস তৈরি করেছে। দেশে ইউরিয়া, ডিএপি এবং এনপিকে সারের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। কৃষকেরা এখন ভারতে তৈরি ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন এবং তাদের প্রাকৃতিক চাষাবাদে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
তিনি যোগ করেন, ‘পিএম কুসুম প্রকল্পের আওতায় ২২ লাখের বেশি সোলার পাম্প সরবরাহ করা হয়েছে, যা ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছে। আমি আত্মবিশ্বাসী, যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভারত এই চ্যালেঞ্জগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করবে এবং আমাদের কৃষকদের সহায়তা অব্যাহত রাখবে।’
তবে মাঠপর্যায়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব স্পষ্ট।
কৃষকেরা বলছেন, অনিশ্চয়তা এরই মধ্যে তাদের সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।
ভারতশাসিত কাশ্মীরের দক্ষিণে পামপোরে শহরে ৫৩ বছর বয়সী সরিষা চাষি গোলাম রসুল বলেন, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আগেই দাম বাড়ার সংকেত দ্রুত পৌঁছে যায়।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ এবং জাহাজ চলাচলে সমস্যার কথা শুনেছি। সংকট সৃষ্টির আগেই সারের দাম বেড়ে যায়।’
রসুল জানান, অনেক সময় সারের প্রকৃত সংকট দেখা দেওয়ার আগেই কৃষকেরা এর ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি কম সার ব্যবহার করি, তাহলে উৎপাদন কমে যাবে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না।’
পাকিস্তানের দক্ষিণ পাঞ্জাবে ৪৫ বছর বয়সী গম চাষি মুনির আহমেদ পরবর্তী বপন মৌসুমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘যদি সারের দাম বেড়ে যায়, তাহলে এখানকার সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাতের মধ্যেও পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারা সারের সরবরাহ নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন।
তাদের দাবি, এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া প্রধান বপন মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার পুরোপুরি প্রস্তুত।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতি বলছে, পাকিস্তানের কৃষিমন্ত্রী রানা তানভীর হুসাইন গত ২৫ মার্চের এক বৈঠকে জানিয়েছেন, সরকার নিবিড়ভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে। একই সঙ্গে দেশে ইউরিয়া ও ডিএপি উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে এবং কৃষকদের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে সার পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন হয়। এর অর্থ হলো, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের যেকোনো ধাক্কা শেষ পর্যন্ত সারের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।