দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত আলোচনার ঠিক আগের দিনগুলোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের নেতারা একে অপরকে হুমকি দেন, যা অনেকটা বিপজ্জনক মরণপণ খেলার মতো ছিল।
শেষ পর্যন্ত, অন্তত ইরানের দৃষ্টিতে, ট্রাম্পই আগে নতি স্বীকার করলেন।
মঙ্গলবার গভীর রাতে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের কেউই দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার জন্য পাকিস্তানে পৌঁছাননি, তখন ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, মার্কিন দাবির বিষয়ে সাড়া দেওয়ার জন্য ইরানের নেতৃত্বকে সময় দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এটি ‘আলোচনা কোনো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো পর্যন্ত’ কার্যকর থাকবে।
ইরানি নেতাদের জন্য এই পরিস্থিতি সম্ভবত তাদের সেই বিশ্বাসকেই আরও পোক্ত করবে, যুদ্ধের যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা ট্রাম্পের চেয়ে তাদেরই বেশি।
নিজেদের দেশে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও ইরান বিশ্বাস করে, ট্রাম্প যে সময় পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির অবরুদ্ধ অবস্থা সহ্য করতে পারবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় তারা মার্কিন নৌ-অবরোধ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, ‘ইরানিরা নিজেদের জন্য সময়কে মাস হিসেবে গণনা করে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য তা সপ্তাহ হিসেবে। তারা মনে করছে, ট্রাম্প আরও তিন সপ্তাহ এই প্রণালি বন্ধ থাকা নিতে পারবেন না।’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে রেখেছে, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এবং প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
এর প্রভাব সারা বিশ্বে অনুভূত হয়েছে। শুধু তেলের দামই বাড়েনি, সার ও গ্যাসের তীব্র সংকটও দেখা দিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্য বড় অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করেছে। ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে প্রথম দফার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প পাল্টা নৌ-অবরোধ জারি করেন, যাতে ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া যায়, যা দেশটির অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
তবে ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার প্রকৃত কারণ এখনো অস্পষ্ট। ট্রাম্প এর জন্য ইরানের ‘মারাত্মকভাবে বিভক্ত’ নেতৃত্বকে দায়ী করেছেন।
অন্যদিকে ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, আলোচনার আগে ট্রাম্প নৌ-অবরোধ তুলে নিতে অস্বীকার করেন এবং সপ্তাহান্তে একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ জব্দ করেন।
মঙ্গলবার রাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘ইরানি বন্দর অবরোধ করা যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন। একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ করে এর ক্রুদের জিম্মি করা আরও বড় অপরাধ। ইরান জানে, অবরোধ কীভাবে ভাঙতে হয় এবং গুন্ডামির মোকাবিলা করতে হয়।’
যুদ্ধের পুরোটা সময় বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও বা মিম ব্যবহার করে ট্রাম্পের হুমকির মুখে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও উদাসীনতা প্রকাশের চেষ্টা করেছে ইরান।
বুধবার সকালে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর ইরানের আধা-সরকারি নিউজ সাইটগুলো একটি ব্যঙ্গচিত্র প্রচার করে, যেখানে দেখা যায় ক্রুদ্ধ ট্রাম্প বোমা মারার হুমকি দিচ্ছেন এবং তার আমেরিকান মধ্যস্থতাকারীরা একটি খালি কক্ষে বসে আছেন। ইরানি প্রতিনিধিরা সেখানে না পৌঁছে শুধু একটি কাগজ পাঠিয়ে দেন, যাতে লেখা, ‘ট্রাম্প, চুপ করো।’
মিলানের ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির ইরান বিশেষজ্ঞ আবদুল রসুল দিভসাল্লার বলেন, ‘আলোচনার প্রধান বাধা আগের মতোই রয়ে গেছে। উভয় দেশই মনে করছে, তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে এবং নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দিতে পারবে। ইরান মার্কিন অভিযান ঠেকাতে পারাকেই নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে। তারা ভাবছে, ট্রাম্পের কাছে আর কোনো ভালো বিকল্প নেই এবং বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে সময় তাদের পক্ষেই কাজ করবে।’
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই দ্বন্দ্বে টিকে গেলেও দেশটির অর্থনীতি হয়তো পারবে না। যুদ্ধের আগেই ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে জানুয়ারি মাসে দেশজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখা দেয়।
ইরানি নেতারা যদিও অর্থনৈতিক ধকল সামলে নেওয়ার কথা বলছেন, তবে এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানিরা প্রতিদিন গণহারে ছাঁটাই এবং মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় ওষুধ ও নিত্যপণ্যের সংকটের কথা তুলে ধরছেন।
আলী ভায়েজ বলেন, ‘ইরানের শাসকগোষ্ঠী কেবল তাদের টিকে থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়। জনগণের দুর্ভোগ তাদের কাছে মুখ্য নয়। তারা এখনও এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছে। আর সে কারণে ইরানি জনগণের ভোগান্তি যতই হোক না কেন, তারা কিছুতেই পিছু হটবে না।’