পশ্চিমবঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি ও বাম-কংগ্রেস জোট নির্ণায়ক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। ২৯৪টি আসনের সবকটিতেই লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন তৃণমূল যেখানে ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া, সেখানে বিজেপির লক্ষ্য তাদের ভিত্তি আরও বাড়িয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ চলছে, যা নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য প্রধান বাধা, টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া। কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, শাসনব্যবস্থা ও জনপরিষেবার ক্ষেত্রে তার সরকারের পারফরম্যান্স গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন ভোটাররা।
একই সঙ্গে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস এই নেতিবাচক প্রভাব কাটাতে তাদের কল্যাণমূলক কর্মসূচি, বিশেষ করে নারীদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রকল্প ও ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তা বলয়কে প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছে।
অন্যদিকে বিজেপি তাদের প্রচার সাজিয়েছে মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতির অভিযোগ, অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরির ইস্যুকে কেন্দ্র করে।
আরজি কর-কাণ্ডের প্রেক্ষাপটে নারী নিরাপত্তা ও কল্যাণও অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা এবং সেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে, বিশেষ করে নারী ও গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে থাবা বসাতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। ২০২১ সালে তৃণমূল ২১৫টি আসন জিতেছিল, যেখানে বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন। বাম ও অন্যরা পেয়েছিল একটি করে আসন।
দুই দফার এই নির্বাচনে বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৫২টি আসনে ভোট হয়। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের আট জেলার সবকটি (৫৪টি) আসন এবং মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, বীরভূম ও হুগলির বেশ কিছু আসন রয়েছে।
বিজেপির জন্য উত্তরবঙ্গ কি আগের মতোই ক্ষমতার মূল প্রবেশপথ হয়ে থাকবে, নাকি তৃণমূল সেখানে হৃত জমি পুনরুদ্ধার করতে পারবে, তা নির্ধারণে এই প্রথম দফা হবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বৃহস্পতিবার ৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ নারী।
বিজেপির কাছে এই দফার গুরুত্ব উত্তরবঙ্গের ফলাফলের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই অঞ্চল বিজেপির উত্থানে জ্বালানি জুগিয়েছিল এবং গত বিধানসভা নির্বাচনে তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছিল।
২০২১ সালে এই ১৫২টি আসনের মধ্যে বিজেপি ৫৯টিতে জিতেছিল। তৃণমূল পেয়েছিল ৯৩টি। ফলে বিজেপির জন্য দক্ষিণবঙ্গে মমতার আধিপত্য মোকাবিলা করার এটাই সেরা সুযোগ।
ক্ষমতাসীন তৃণমূলের জন্য বিজেপির এই জোয়ার ঠেকানোই হবে পরবর্তী দফার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরির মূল চাবিকাঠি।
জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের চা বাগান থেকে শুরু করে দার্জিলিং ও কালিম্পঙের পাহাড়, কোচবিহারের রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকা, মালদহ ও উত্তর দিনাজপুরের সীমান্ত জেলা এবং মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু প্রধান এলাকা—ভৌগোলিক ও জনতাত্ত্বিকভাবে এই লড়াই বেশ বৈচিত্র্যময়।
তবে সব ছাপিয়ে জেলাগুলোতে একটি ইস্যু প্রধান হয়ে উঠেছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। এই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লাখের বেশি নাম বাদ পড়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।
শুধু মুর্শিদাবাদেই ৭ দশমিক ৪৮ লাখের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এরপর রয়েছে নদীয়া (৪ দশমিক ৮৫ লাখ), মালদহ (৪ দশমিক ৫৯ লাখ), উত্তর দিনাজপুর (৩ দশমিক ৬৩ লাখ) ও কোচবিহার (২ দশমিক ৪২ লাখ)।
এর ফলে প্রচারের মোড়ও ঘুরে গেছে। স্কুলে নিয়োগে দুর্নীতি, বেকারত্ব বা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের চেয়ে আলোচনায় এখন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে ‘নাগরিকত্ব’, ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘ভুয়া ভোটার’ এবং ‘বিদেশি’র মতো শব্দগুলো।
বিজেপি এই ভোটার তালিকা সংশোধনকে অনুপ্রবেশ ও নাগরিকত্বের গণভোট হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে তৃণমূল একে বৈধ ভোটারদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু, পরিযায়ী শ্রমিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছে।
বিজেপির ধারাবাহিক উত্থান
সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উপস্থিতি ছিল সীমিত। ২০০৯ সালে তারা কোনো আসন পায়নি এবং ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট পেয়েছিল মাত্র ৪ শতাংশ। তাদের উত্থান শুরু হয় ২০১৪ সালে, যখন তারা লোকসভার দুটি আসন জেতে এবং ভোটের হার ১৭ শতাংশে উন্নীত করে।
এরপর ২০১৬ সালে ১০ শতাংশ ভোট এবং ২০১৯ সালে ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ১৮টিতে জিতে ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পায় তারা। ২০২১ সালে বিজেপি ৭৭টি আসন জেতে, যার বেশিরভাগই ছিল উত্তরবঙ্গে।
এবারের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন রেকর্ডসংখ্যক ২ হাজার ৪৫০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে এবং ৮ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ‘অতি সংবেদনশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে অস্বাভাবিক সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিজেপি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন।
হুগলির হরিপালে এক সমাবেশে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদির উদ্দেশে বলেন, এসব সাঁজোয়া যান মণিপুরে পাঠানো উচিত, যেখানে তিন বছর ধরে অশান্তি চলছে।
মোদি ও অমিত শাহকে মণিপুরে গিয়ে সভা করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলায় সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে একসঙ্গে বাস করে।’
মোহাম্মদ আলী আউটলুক ইন্ডিয়ার জ্যেষ্ঠ সহযোগী সম্পাদক
আউটলুক ইন্ডিয়া থেকে নেওয়া