ভারতের কিংবদন্তি আলোকচিত্রী ও ফটোসাংবাদিকতার অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত রঘু রাই রোববার (২৬ এপ্রিল) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ক্যানসারের সঙ্গে দুই বছরের লড়াই শেষে ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তার।
রঘু রাইয়ের ছেলে জানান, দুই বছর আগে তার বাবার প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়েছিল। পরে ক্যানসার তার পাকস্থলী, সম্প্রতি মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া বয়সজনিত বিভিন্ন জটিলতাও ছিল এই আলোকচিত্রীর।
১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঝাং-এ (বর্তমানে পাকিস্তানে) জন্মগ্রহণকারী রঘু কেবল ভারতেই নন, সারা বিশ্বে অন্যতম সম্মানিত আলোকচিত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
পরে ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসেবে যোগ দেন রঘু। ১৯৭৬ সালে পত্রিকাটি ছেড়ে শুরু করেন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফি। ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত রঘু ইন্ডিয়া টুডের ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর জুরি সদস্য।
রোববার দ্য স্টেটসম্যান এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়, রঘু রাই তখন এই পেশায় মাত্র পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা থেকে বাঁচতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর স্রোত নথিবদ্ধ করতে এই পত্রিকা তাকে দ্রুত সেখানে পাঠায়।
দেশভাগের সময় নিজ জন্মভূমি ঝাং থেকে সপরিবারে উচ্ছেদ হওয়া রঘু রাই শরণার্থীদের দুর্দশা খুব সহজে অনুভব করতে পেরেছিলেন। তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একের পর এক ছবি দ্য স্টেটসম্যানে পাঠিয়ে যাচ্ছিলেন, যা সেসময় ভারতজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পায় এবং মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।
তবে দুঃখের বিষয় হলো, রঘু রাইয়ের সেই নেগেটিভগুলোর সম্পূর্ণ সংগ্রহ একসময় হারিয়ে যায়, যা দীর্ঘ সময় পর উদ্ধার করা হয়।
সেই ছবিগুলোর সংকলনেই প্রকাশিত হয় ‘বাংলাদেশ: দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম’ বইটি, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিয়োগী বুকস থেকে প্রকাশ করা হয়।
ভারতীয় বার্তা সংস্থা আইএএনএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রঘু রাই বলেছিলেন, ‘১৯৪৭ সালে যখন আমরা পাকিস্তান থেকে উচ্ছেদ হয়ে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আসি, তখন থেকে বিষয়টির সঙ্গে আমার এক ধরনের মানসিক যোগসূত্র তৈরি হয়। পূর্ববঙ্গের শরণার্থীদের দুর্দশা দেখে আমি গভীরভাবে বিচলিত হয়েছিলাম। এরপর সেই নেগেটিভগুলো হারিয়ে যায়। কোনো এক বড় বান্ডিলের ভেতর সেগুলো দীর্ঘকাল পড়েছিল।
“হঠাৎ একদিন আমার সহকারী, যে আমার গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলো স্ক্যান করছিল, বলে উঠল, ‘এই যে, বাংলাদেশের শরণার্থীদের ছবির প্যাকেটটি এখানে!’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আসলেই?’ দীর্ঘ ৪০ বছর পর আমরা এটি খুঁজে পেয়েছিলাম।”
‘বাংলাদেশ: দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম’ প্রকাশের কারণ সম্পর্কে সাক্ষাৎকারে রঘু রাই বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক আলোকচিত্রী বাংলাদেশের শরণার্থীদের ছবি তুলেছিলেন। যেমন সানডে টাইমসের ডন ম্যাককুলিন একটি ফিচার করেছিলেন। অত্যন্ত চমৎকার একটি ফিচার। সেটি দেখে আমি ভেবেছিলাম, ‘তিনি কী অসাধারণ কাজই না করেছেন!’ এরপর তিনি দ্রুত একটি বইও প্রকাশ করেন এবং আমি বলেছিলাম, ‘খুবই ভালো!’ তখন আমি নিজের কাজের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। এরপর দীর্ঘ ৪০ বছর পর যখন আমি আমার নিজের কাজগুলো দেখলাম, তখন বলে উঠলাম, ‘ঈশ্বর, এগুলোর তো নিজস্ব তীব্রতা এবং বার্তা রয়েছে, যা সবার সঙ্গে শেয়ার করা প্রয়োজন।’ এরপর আমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলি এবং এভাবেই বইটির পরিকল্পনা তৈরি হয়।”
বইটির জন্য যখন রঘু রাই পুনরায় ছবিগুলো পর্যালোচনা করছিলেন এবং বাছাই করছিলেন, তখন তার ভাবনা কী ছিল—সাক্ষাৎকারে এই প্রশ্নের জবাবে আলোকচিত্রী বলেন, “দেখুন, এখানে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। একটি হলো ১৯৭১-৭২ সালে আলোকচিত্রী হিসেবে আমার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। আমি প্রচণ্ডভাবে এবং গভীরভাবে এর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আলোকচিত্রী হিসেবে আমি তখন খুবই তরুণ। আমি ডন ম্যাককুলিনের কাজ দেখেছিলাম, যিনি আমার চেয়ে ১১ বছরের সিনিয়র। এরপর যখন আমি নিজের ছবিগুলো খুঁজে পেলাম এবং আমার কাজের তুলনা করলাম, তখন ভাবলাম, ‘আমি যেহেতু এই কাজগুলো করেছি, তাই এগুলো জনসম্মুখে নিয়ে আসি’।”
‘তখন আমি আবিষ্কার করলাম, আলোকচিত্রী হিসেবে আমার বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর হওয়া সত্ত্বেও আমি যে তীব্রতা এবং যন্ত্রণার চিত্রগুলো ধারণ করতে পেরেছিলাম, তা এতটাই শক্তিশালী ও মর্মস্পর্শী ছিল, আমি ভাবলাম এগুলো আমার অবশ্যই শেয়ার করা উচিত,’ যোগ করেন রঘু রাই।
দ্য স্টেটসম্যান প্রতিবেদনটিতে বলছে, গল্পগুলো হয়তো অজানা নয়, কিন্তু একজন দক্ষ গল্পবলিয়ের হাতে সেগুলো নতুন করে বলা হয়। শরণার্থী শিবির, দেশত্যাগ, অন্তহীন যাত্রা, মর্মস্পর্শী ও যন্ত্রণাকাতর ইতিহাসের আবর্ত। পরিশেষে, একটি নতুন দেশ, নতুন আগামী।
‘বাংলাদেশ: দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম’ বইটিতে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মোড়কে নথিবদ্ধ করা এই কাজগুলো এমন একজনের করা, যিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর যখন জেনারেল স্যাম মানেকশ সেনাবাহিনীকে অভিযানে নামার নির্দেশ দেন, তখন রাই প্রথম কলামের সঙ্গেই গাড়ি চালিয়ে অগ্রসর হন, যারা আক্রমণের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। তারা যশোর রোড হয়ে খুলনার দিকে যাচ্ছিলেন, যে পথটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছিল।
সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বইটিতে রঘু লিখেছেন, ‘প্রথম ৪০-৪৫ কিলোমিটার সহজ ছিল। কিন্তু এরপর আমরা যখন খুলনা সেক্টরের কাছাকাছি পৌঁছালাম, আমাদের স্বাগত জানানো হলো কামানের গোলার মাধ্যমে। তাদের গোলন্দাজ বাহিনী ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সংবাদদাতার সহায়তায় শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করছিল এবং লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছাকাছি চলে আসছিল। আমাদের অবস্থান শনাক্ত করে অতর্কিত হামলা চালানো হলো। সেই হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।
‘আমি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, এমন কিছু আহত সেনার ছবি তুললাম। কিন্তু প্রশ্ন, আমি আসলে কতগুলো ছবি তুলতে পারব? পরবর্তী শিকার তো আমরাও হতে পারি। যে মেজর আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি আমাকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বললেন। আমরা আধা কিলোমিটার দৌড়ে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে গেলাম। একটি চায়ের দোকান দেখে আশ্বস্ত হলাম এবং চা-বিস্কুটের অর্ডার দিলাম। আমি বেশ সন্তুষ্ট ছিলাম, খুব কাছ থেকে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হলো, অ্যাকশন ছবি তুলতে পারলাম এবং বেঁচে ফিরলাম! আমি রাস্তার ওপর সেসময় আড়মোড়া ভাঙছিলাম, ঠিক তখনই একটি বুলেট আমার পাশ দিয়ে উড়ে গেল। মেজর চিৎকার করে আমাকে শুয়ে পড়তে বললেন। আমি শুয়ে পড়লাম। আরও একটি বুলেট আমার পাশ দিয়ে চলে গেল। আমি হামাগুড়ি দিয়ে দোকানের পেছনে গেলাম এবং দোকানদারের কাছে শুনলাম, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রেললাইনের ঠিক উল্টো পাশেই ছিল, মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে।
‘এটি সম্ভবত বিশ্বের যেকোনো জাতির লড়া এবং জেতা সংক্ষিপ্ততম যুদ্ধ। এর কারণ ছিল বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতি বিরূপ হয়ে উঠেছিল। বাকি কাজটুকু সম্পন্ন করেছিল ভারতীয় বিমানবাহিনী। যুদ্ধের ১২তম দিনে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
‘আমি একটি আর্মি হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় উড়ে গিয়েছিলাম বিজয় এবং লাঞ্ছনার, জয় এবং আত্মসমর্পণের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে। ইন্দিরা গান্ধীর সাহসী সিদ্ধান্ত, জেনারেল মানেকশর মোক্ষম চাল এবং জেনারেল জ্যাকবের কৌশলগত পরিকল্পনা নয় মাসের নৃশংসতা ও বিভীষিকার অবসান ঘটিয়েছিল। বাংলাদেশিদের ওপর চালানো ধর্ষণ, নির্যাতন এবং অমানবিকতা, যা ছিল তাদের স্বাধীনতার জন্য দেওয়া চড়া মূল্য,’ বলেন রঘু রাই।