মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো, বিশেষ করে গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ইসরায়েলকে ঘিরে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বহু দশকের নির্মিত নৈতিক বয়ান এখন ক্রমশ ভেঙে পড়ছে।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক জনাথান কুক তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দাবি করেছেন, গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং লেবাননে সামরিক অভিযান শুধু ইসরায়েলের ভাবমূর্তিকেই নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
কুকের মতে, বহু বছর ধরে পশ্চিমা রাজনীতি ও গণমাধ্যমে ইসরায়েলকে অবরুদ্ধ কিন্তু আত্মরক্ষাকারী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিপরীতে ফিলিস্তিনি ও আরব বয়ানকে প্রায়শই প্রান্তিক আর নেতিবাচক ধারায় উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্যাটেলাইট ছবি এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার বিস্তারের ফলে ইরানসহ যে কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা এখন আগের মতো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষণে বলা হয়, গাজায় হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও আবাসিক এলাকায় হামলার দৃশ্য আন্তর্জাতিক জনমতকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর ভেতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে বিভক্তি বাড়ছে। ইসরায়েলের সামরিক কৌশল নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় কয়েকটি বিশ্লেষণধর্মী প্রকাশনায় বলা হয়, ইসরায়েল এখন শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই; বরং অঞ্চলজুড়ে আরও আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী নীতি অনুসরণ করছে।
ফরাসি সংবাদপত্র লা মঁদ-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়, গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েল সীমান্ত অঞ্চলে বাফার জোন তৈরির নামে লেবানন ও সিরিয়ার ভেতরে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন ও ইউরোপীয় সমর্থনের বিষয়টিও নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রধান কৌশলগত মিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ ক্রমেই বড় হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, গাজায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় পশ্চিমা সরকারগুলোর অবস্থান দ্বৈত মানদণ্ডের পরিচয় দিচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটর পোস্ট-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ইসরায়েল–ফিলিস্তিন প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে জনমত এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট ও তা আর পশ্চিমাদের পক্ষে নেই। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যুদ্ধের সরকারি বয়ান বিশেষ করে পশ্চিমাদের মনগড়া বয়ানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
এদিকে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি সমাজের ভেতরেও যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে গভীর মানসিক বিভাজন তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলে যুদ্ধবিরোধী বড় বড় বিক্ষোভ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি উত্তেজনা পশ্চিমা শক্তির সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। সস্তা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান যে চাপ তৈরি করেছে, তা মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। আগের সব সমীকরন পাল্টে গেছে তাসের ঘরের মতো।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এই যুদ্ধ শুধু ভূখণ্ড বা সামরিক সংঘর্ষ নয়, এটি একই সঙ্গে তথ্যযুদ্ধ এবং বয়ানের যুদ্ধ। বহু দশক ধরে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা রাজনৈতিক ভাষা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিকল্প সাংবাদিকতার চাপে নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে বিশ্ব রাজনীতির যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে পশ্চিমা কূটনীতি, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও বৈশ্বিক জনমতের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, যুদ্ধের ফলাফল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় না, অনেক সময় সেটি নির্ধারিত হয় মানুষের বিবেক, তথ্যপ্রবাহ ও বিশ্বজনমতের আদালতে।