বিশ্ব রাজনীতি আবার যেন ধীরে ধীরে নতুন এক কোল্ড ওয়ার বা ঠান্ডা যুদ্ধের দিকে হাঁটছে। তবে এবার সোভিয়েত ইউনিয়ন আর যুক্তরাষ্ট্রের জায়গায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। পার্থক্য শুধু একটাই, এই যুদ্ধ ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র বা সৈন্য দিয়ে নয়; প্রযুক্তি, বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের লড়াই দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই আগামী ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক শুধু দুই নেতার কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং আগামী কয়েক বছরের বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে যাবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হতে পারে আলোচনার মূল বিষয় বাণিজ্য যুদ্ধ, শুল্ক, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা কিংবা তাইওয়ান। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি আরও গভীরের। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, ইরান যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দুই দেশই বুঝতে পারছে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি ভয়াবহ হতে পারে। ফলে প্রতিযোগিতা থামছে না, তবে সেটিকে ম্যানেজ করার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বৈঠকে যাচ্ছেন চাপের বোঝা মাথায় নিয়ে। দেশে নির্বাচনী রাজনীতি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব তার প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করেছে। তিনি এমন কিছু সাফল্য চান, যা মার্কিন ভোটারদের সামনে তুলে ধরা যাবে। বিশেষ করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, চীনের কাছ থেকে কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি আদায় এবং মার্কিন শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা উপাদানের সরবরাহ নিশ্চিত করা ট্রাম্পের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
প্রসঙ্গত, বিরল মৃত্তিকা উপাদান হলো পর্যায় সারণীর ১৭টি বিশেষ ধাতুর একটি গ্রুপ, যা স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, এবং যুদ্ধবিমান তৈরির মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে অপরিহার্য। বিশ্বে এই খনিজ উত্তোলনের প্রায় ৬১% এবং প্রক্রিয়াকরণের ৯২% চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকায় এর সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক যুদ্ধ চলছে।
ট্রাম্পকে ঘিরে ওয়াশিংটনের ভেতরেও এক ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক নাটকীয়তাকে অনেক সময় কৌশলগত বাস্তবতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেন। ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, চীনের সঙ্গে একটি দৃষ্টিনন্দন চুক্তি করতে গিয়ে তিনি তাইওয়ান বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে নরম অবস্থান নিতে পারেন।
অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের লক্ষ্য অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি। তিনি জানেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি এটাও বিশ্বাস করেন যে, সময় এখন ধীরে ধীরে চীনের পক্ষে চলে আসছে। গত এক দশকে চীন শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক প্রভাবেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
চীনের দ্বৈত সঞ্চালন অর্থনৈতিক কৌশলের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিদেশি প্রযুক্তি ও পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং নিজস্ব শিল্প ও প্রযুক্তিকে শক্তিশালী করা। ফলে ট্রাম্প হয়তো তাৎক্ষণিক কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা চাইছেন, কিন্তু বেইজিংয়ের চিন্তা অনেক বেশি কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি।
এই বৈঠকের আরেকটি বড় ছায়া হচ্ছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজার এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চীন ইরানের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়ায় ওয়াশিংটন এখন বুঝতে পারছে, তেহরানকে প্রভাবিত করতে বেইজিংয়ের সহায়তা প্রয়োজন। অন্যভাবে বললে, যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকেও কিছু বিষয়ে দরকার মনে করছে।
তাইওয়ান ইস্যুটিও এই বৈঠকের কেন্দ্রীয় আলোচনার একটি অংশ। চীন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে এসেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের নিরাপত্তাকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনা বেড়েছে। তাইপে আশঙ্কা করছে, বৃহত্তর কৌশলগত সমঝোতার অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন হয়তো ভাষা বা অবস্থানে কিছুটা নমনীয় হতে পারে।
এই পুরো পরিস্থিতিকে অনেকে নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তবে এটি আগের ঠান্ডা যুদ্ধের মতো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের সংঘাত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, আবার একইসঙ্গে পরস্পরের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীলও। একদিকে তারা প্রযুক্তি যুদ্ধ করছে, অন্যদিকে দুই দেশের বাণিজ্য এখনো শত শত বিলিয়ন ডলারের। এই দ্বৈত সম্পর্কই বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং বৈঠক থেকে হয়তো বড় কোনো ঐতিহাসিক চুক্তি আসবে না। কিন্তু দুই পক্ষই চাইবে উত্তেজনা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। কারণ ওয়াশিংটন ও বেইজিং দু’পক্ষেই জানে, সরাসরি সংঘাত শুধু দুই দেশের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
সব মিলিয়ে এই বৈঠক আসলে দুই নেতার ব্যক্তিগত কূটনীতির চেয়ে অনেক বড় কিছু এ বিশ্বের জন্য। এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন বিশ্ব আবার নতুন শক্তির লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছে। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি রাষ্ট্র, একটি বর্তমান পরাশক্তি, অন্যটি উঠতি পরাশক্তি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও মডার্ন ডিপ্লোমেসি।