ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির হাতে আসা একটি অনলাইন ভিডিও ইঙ্গিত দিচ্ছে, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সামরিক বিমানগুলোকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এটি কেবল ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের সময়ই নয়, বরং যখন তেহরান কোনো সংঘাতের মুখে পড়েছে, তখনই পাকিস্তান এই ভূমিকা পালন করেছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসের সেই ইউটিউব ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, করাচি বিমানবন্দরের টারমার্কে ইরানের পরিবহন বিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান দাঁড়িয়ে আছে। এটি এমন সময়ের দৃশ্য, যখন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ইসরায়েলের চালানো অভিযান রাইজিং লায়ন শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পার হয়েছে।
বুধবার (১৩ মে) এই ভিডিওর স্ক্রিনশট এনডিটিভির হাতে আসার একদিন আগে সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পাকিস্তান বর্তমানে ইরানের সামরিক বিমানগুলোকে লুকিয়ে রাখছে।
এই দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
এনডিটিভির বুধবারের এই প্রতিবেদন সিবিএস নিউজের দাবিকে সমর্থন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনটিতে গত ২৫ এপ্রিল পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির কাছে নূর খান বিমানঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে থাকা ইরানের বিমানবাহিনীর একটি আরসি-১৩০এইচ বিমানের স্পষ্ট স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশ করা হয়।
আরসি-১৩০এইচ হলো কয়েক দশক ধরে ইরানের ব্যবহৃত সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানের একটি বিশেষ সংস্করণ।
ইনটেল ল্যাবের গবেষক ড্যামিয়েন সাইমন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, বিমানটি এ বছরের ১১ থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে কোনো এক সময়ে নূর খান বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছিল। এটি অন্তত ১২ মে পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করছিল। অর্থাৎ পৌঁছানোর প্রায় এক মাস পরও বিমানটি একই জায়গায় ছিল।
এই প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে বলেন, তিনি পাকিস্তানকে ‘বিশ্বাস করেন না’।
গ্রাহাম বলেন, ‘যদি তারা (পাকিস্তান) সত্যিই ইরানের সামরিক সম্পদ রক্ষার জন্য নিজেদের ঘাঁটিতে সে দেশের বিমানগুলোকে জায়গা দিয়ে থাকে, তাহলে আমার মনে হয়, আমাদের অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারী খোঁজা উচিত। অবাক হওয়ার কিছু নেই, কেন এই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা কোনো দিকেই এগোচ্ছে না।’
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আপলোড করা ওই ভিডিওতে দেখা যায়, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে চরম উত্তেজনার সময় ইরান তাদের একমাত্র কেসি-৭৪৭ (বোয়িং ৭৪৭-এর একটি সংস্করণ) বিমানটি (আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান) করাচি বিমানবন্দরে রেখেছিল।
ধারণা করা হয়, পশ্চিম এশিয়ায় দুই মাস আগে শুরু হওয়া যুদ্ধে এই বিমানটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে, সম্ভবত তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে।
২০২৫ সালের ওই ভিডিওতে ইরানের বিমানবাহিনীর একটি কেসি-৭০৭ বিমানকেও (জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান) দেখা যায়, যা মূলত বোয়িং ৭০৭-এর একটি সংস্করণ।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই পুরনো জেটগুলো কয়েক দশক ধরে ইরানি বিমানবাহিনীর শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে, বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা আধুনিক বিমান কিনতে পারছে না।
ইরান যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় এই ধরনের অন্তত দুটি বিমান ধ্বংস হয়েছে।
এদিকে পাকিস্তান সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘নূর খান বিমানঘাঁটিতে ইরানি বিমানের উপস্থিতি নিয়ে সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর এবং চাঞ্চল্যকর। পাকিস্তান এটি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
‘এই ধরনের অনুমানমূলক প্রচারণা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখার বর্তমান প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে চালানো হচ্ছে বলে ধারণা আমাদের।’