পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তে জমে থাকা বিশাল বরফের মহাদেশ আন্টার্কটিকা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। এতদিন ধারণা করা হতো, মূলত উপরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই ধীরে ধীরে গলছে বরফ। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, বরফ শুধু ওপরে নয়, নিচ থেকেও দ্রুত গলছে। আর এই গলন আগের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি নরওয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসি৩ পোলার রিসার্চ হাব এবং আকভাপ্লান-নিভা’র বিজ্ঞানীরা আন্টার্কটিকার পূর্ব অংশে অবস্থিত ফিম্বুলিসেন নামের একটি বিশাল আইস শেলফ নিয়ে গবেষণা চালান। আইস শেলফ বলতে মূল ভূখণ্ডের বরফ থেকে সমুদ্রের ওপর ভেসে থাকা বিশাল বরফচাদরকে বোঝায়। এই বরফচাদরগুলোকে বিজ্ঞানীরা অনেকটা বাঁধের সঙ্গে তুলনা করেন। কারণ এগুলো মূল হিমবাহকে দ্রুত সমুদ্রে নেমে যেতে বাধা দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, আইস শেলফের নিচে থাকা গভীর চ্যানেল বা প্রণালীগুলোতে তুলনামূলক উষ্ণ সমুদ্রের পানি আটকে যাচ্ছে। এই উষ্ণ পানি বরফের নিচের অংশকে দ্রুত গলিয়ে দিচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় বরফ গলার হার প্রায় দশ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
গবেষক তোরে হ্যাটারম্যান বলেছেন, তারা দেখেছেন সামান্য উষ্ণ পানিও বরফ গলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে বরফের নিচের চ্যানেলগুলো আরও বড় হয়ে ওঠে এবং একসময় পুরো আইস শেলফ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি শুধু আন্টার্কটিকার সমস্যা নয়। কারণ এই বরফচাদর দুর্বল হয়ে গেলে পেছনের বিশাল হিমবাহগুলো দ্রুত সমুদ্রে নেমে আসবে। আর সেটিই বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার বড় কারণ হতে পারে। ইতোমধ্যে প্রতিবছর প্রায় তিন মিলিমিটার করে সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। নতুন এই গবেষণা বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি হয়তো আরও খারাপ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতদিন পূর্ব আন্টার্কটিকাকে তুলনামূলক নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে ধরা হতো। কারণ পশ্চিম আন্টার্কটিকার মতো সেখানে বরফ গলার হার এত বেশি ছিল না। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পূর্ব অংশও ঝুঁকির বাইরে নয়। বরফের নিচে উষ্ণ পানি জমে থাকলে সেখানে দ্রুত ভাঙন শুরু হতে পারে।
গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা বরফের নিচের অংশের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেন। কোথায় কত গভীর চ্যানেল আছে, কোথায় পানি আটকে থাকছে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পান, বরফের গঠনই অনেক ক্ষেত্রে উষ্ণ পানি আটকে রাখার পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে গলন প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, আন্টার্কটিকার বরফ গলন বিশ্বব্যাপী উপকূলীয় শহরগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠ বেড়ে গেলে ডুবে যেতে পারে নিম্নাঞ্চল, বাড়তে পারে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি। বাংলাদেশসহ উপকূলীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাম্প্রতিক আরও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন দশকে আন্টার্কটিকার বিশাল অংশের স্থলভিত্তিক বরফ হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে উষ্ণ সমুদ্রস্রোত বরফের নিচে ঢুকে পড়ায় কিছু অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত সরে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা চলতে থাকলে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতি বর্তমান পূর্বাভাসের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সায়েন্স ডেইলি ও স্পেস