১২ বছরের কিশোরেরা সচরাচর অনেক কিছুই জানে—কীভাবে স্কুল ফাঁকি দিতে হয়, কোন অ্যাপগুলো এখন জনপ্রিয় কিংবা খেলাধুলায় কীভাবে জিততে হয়। কিন্তু ইউক্রেনের এক কিশোর জানে, তার ভাইবোনের দিকে ধেয়ে আসা রুশ ড্রোনকে কীভাবে অকেজো করতে হয়।
এক বিকেলে আনাতোলি প্রোখোরেঙ্কো এক প্রতিবেশীর বাড়ির নাশপাতি গাছে উঠে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ডাল কাটছিল। ঠিক তখনই সে পরিচিত একটি শব্দ শুনতে পেল—ড্রোনের শব্দ।
১২ বছর বয়সী এই কিশোর তার পরিবারের সঙ্গে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ অঞ্চলের একটি ছোট কৃষিপ্রধান গ্রামে থাকে, যা রুশ সীমান্ত থেকে মাত্র সাত মাইল দূরে। তাই ড্রোনের শব্দের সঙ্গে সে বেশ পরিচিত।
গত মার্চ মাসেই একটি রুশ ড্রোন স্থানীয় দোকানের পাশে থাকা একটি গাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল। এমনকি কিছুদিন আগেও তার বাড়ির সামনের রাস্তায় আরেকটি ড্রোনের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। আর এবারের ড্রোনটি সরাসরি তার বাড়ির দিকেই আসছিল।
সে দেখল, একটি কালো রঙের কোয়াডকপ্টার মাটির ঠিক ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে সেই ভবনগুলোর সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তার ছোট তিন ভাইবোন আরও কিছু শিশুর সঙ্গে খেলছিল।
প্রোখোরেঙ্কো দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলে, ‘ড্রোনটি শিশুদের দেখতে পেয়ে আরও উঁচুতে উঠতে শুরু করে। তখনই আমি বুঝতে পারলাম যে, ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’
এরপর প্রোখোরেঙ্কো যা করল, তা হয়তো তার ভাইবোনদের প্রাণ বাঁচিয়ে দিয়েছে। সেসময় তার মনে পড়ে গেল, ডায়নামো ছদ্মনামের এক সেনার সঙ্গে হওয়া তার কথোপকথন।
ডায়নামোর সেই শিক্ষা
কয়েক মাস আগে প্রোখোরেঙ্কো তার বাবার সঙ্গে পাশের এক বনে লাকড়ি কাটতে গিয়েছিল। সেখানে সে এক ইউক্রেনীয় সেনাকে চিকচিক করা সরু এক ধরনের সুতা নিয়ে কাজ করতে দেখে। কৌতূহলী হয়ে সে ওই সেনাকে জিজ্ঞেস করে, এগুলো কী।
বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ওই সেনা তাকে বুঝিয়ে বলেন, সুতাটি আসলে ফাইবার-অপটিক ফিলামেন্ট, যা খালি হাতে ছেঁড়া প্রায় অসম্ভব। তিনি ছেলেটিকে তিনটি বিশেষ কৌশল শিখিয়ে দেন, যার মাধ্যমে বিশেষ পদ্ধতিতে প্যাঁচ দিয়ে এবং চিমটি কেটে ওই সুতা ছিঁড়ে ফেলা সম্ভব।
ডায়নামো তাকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল শিখিয়েছিলেন। ড্রোনটি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পর অন্তত ১৫ পর্যন্ত গুনতে হবে, যাতে ড্রোনের অপারেটর তাকে আর দেখতে না পায়।
প্রোখোরেঙ্কো প্রতিটি নির্দেশনা মনে রেখেছিল। গাছের মগডালে বসে ড্রোনের শব্দ শোনার পরপরই সে খুঁজতে শুরু করল সেই চিকচিকে সুতাটি, যা ড্রোনটির পেছন থেকে ঝুলছিল।
একপর্যায়ে সে তার লক্ষ্য স্থির করল। গাছ থেকে একলাফে নেমেই সে দৌড় দিল এবং তার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল চুলের মতো সেই সরু সুতাটি।
এই সুতার অন্য প্রান্ত সুদূর রাশিয়ায় কোনো এক নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রোখোরেঙ্কো সুতাটি দিয়ে একটি প্যাঁচ তৈরি করল এবং হালকা টান দিল। ডায়নামোর সেই নির্দেশ মনে পড়ল, ১৫ পর্যন্ত গুনতে হবে।
প্রোখোরেঙ্কো বলে, ‘আমার হাতে সময় মোটেও ছিল না। তাই আমি ১০ পর্যন্ত গুনেই সুতাটি ছিঁড়ে ফেললাম।’
সুতাটি ছিঁড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ হারায়। সেটি খেলা করা শিশুদের দিকে না গিয়ে উল্টোদিকে ঘুরে যায় এবং পাশের এক ঝোপঝাড়ের মধ্যে আছড়ে পড়ে। পরে জানা যায়, ড্রোনটি একটি জলাভূমিতে বিধ্বস্ত হয়েছে।
ডায়নামো দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘কোনো সেনা মুহূর্তের মধ্যে এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারত, তা নিশ্চিত নই। সেখানে একজন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে একটি শিশু কীভাবে এমন অসাধ্য সাধন করল?’
ফাইবার-অপটিক ড্রোনের উত্থান
বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে ছোট বাণিজ্যিক ড্রোনের ব্যবহার ইউক্রেন যুদ্ধে নতুন কিছু নয়। প্রায় দুই বছর আগে খেরসন অঞ্চলে এই কৌশলের সূচনা হয়।
দিনিপ্রো নদীর ওপার থেকে রুশ বাহিনী সস্তা ফার্স্ট-পারসন ভিউ কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি শুরু করে। সাইকেল আরোহী, পথচারী, এমনকি যারা কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হতেন, কেউই এই ড্রোনের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছিলেন না।
২০২৪ সালের নভেম্বরের একটি ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। সেখানে একটি ড্রোন প্রথমে এক মোপেড (খুব হালকা ওজনের এক ধরনের দ্বিচক্রযান) আরোহীর ওপর বিস্ফোরণ ঘটায় এবং পরে তাকে উদ্ধার করতে আসা অ্যাম্বুলেন্সটির ওপর আরেকটি বোমা ফেলে।
জাতিসংঘের একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল নাগাদ এ ধরনের হামলায় অন্তত ৪২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হন।
তদন্তকারীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান, সাধারণ মানুষের মনে পদ্ধতিগতভাবে ত্রাস সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই মস্কো থেকে এই অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
শুরুতে ইউক্রেন জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এর মোকাবিলা করার চেষ্টা করে, যা ড্রোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা তরঙ্গকে বাধাগ্রস্ত করত।
এর জবাবে রাশিয়া নিয়ে আসে ফাইবার-অপটিক টেথার প্রযুক্তি। এতে ড্রোনের পেছন থেকে চুলের মতো সরু একটি সুতা বা তার প্রায় ১২ মাইল পর্যন্ত ঝুলে থাকে। যেহেতু এটি রেডিও তরঙ্গের ওপর নির্ভর করে না, তাই কোনো জ্যামিং প্রযুক্তি দিয়ে এই ড্রোনকে থামানো সম্ভব নয়।
দেশে বীর, অনলাইনে টার্গেট
পুরো ইউক্রেনজুড়ে প্রোখোরেঙ্কো এখন এক বীরের নাম। তাকে নিয়ে চারদিকে উদযাপনের জোয়ার বইছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। রাশিয়ার বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেলে তাকে লক্ষ্য করে শুরু হয়েছে নানা ধরনের হুমকি। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সাত সদস্যের এই পরিবারটি তাদের গ্রাম ছেড়ে চেরনিহিভ শহরে এক দুই কক্ষের ভাড়াবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।