ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যতটা উত্তেজনা ছিল, সফর শেষে ততটাই বেড়েছে বিতর্ক। সফরের আগে মার্কিন প্রশাসন এটিকে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরলেও, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় একটি অংশ বলছেন, এই সফরে বেইজিংয়ের চেয়ে ওয়াশিংটনের প্রয়োজনই ছিল বেশি। কারণ ট্রাম্প এমন এক সময়ে চীনে গেলেন, যখন আমেরিকা একসাথে চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে কৌশলগত টানাপোড়েনে জড়িয়ে আছে, আবার নিজেদের অর্থনীতিও ভুগছে মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ সংকট এবং শিল্পখাতের চাপ নিয়ে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজে বিমানবন্দরে ট্রাম্পকে স্বাগত না জানিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্টকে পাঠানো নিয়েও আন্তর্জাতিক কূটনীতিক মহলে আলোচনা হয়েছে। সাধারণত বড় শক্তিধর রাষ্ট্রপ্রধানদের সফরে অভ্যর্থনার ধরনও রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। ব্রিটিশ পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান ও বিভিন্ন মার্কিন বিশ্লেষকরা লিখেছেন, বেইজিং শুরু থেকেই বোঝাতে চেয়েছে, এই সফরে ওয়াশিংটনের প্রয়োজন বেশি, চীনের নয়।
ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন এক ডজনের বেশি বড় মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্রযুক্তি, কৃষি ও বিমান খাতের বড় কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা ছিলেন। সফরের অন্যতম বড় লক্ষ্য ছিল চীনের বাজারে আবারও মার্কিন কোম্পানিগুলোর অবস্থান শক্ত করা। বিশেষ করে মার্কিন কৃষক ও বোয়িং কোম্পানির জন্য চীনা বাজার ধরে রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের বড় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ গত কয়েক বছরে চীন ধীরে ধীরে ব্রাজিল, রাশিয়া ও নিজস্ব উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে মার্কিন সয়াবিনের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। একইভাবে ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কও বেড়েছে।
এই সফরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে হরমুজ প্রণালি ও ইরান প্রসঙ্গ। ট্রাম্প সফরের আগে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালী অবশ্যই খোলা রাখতে হবে। কারণ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবে পরিস্থিতি অনেক জটিল। ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, চাইলে তারা অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বাড়াতে পারে, আবার নিজেদের মিত্র দেশগুলোর জাহাজ চলাচলও সচল রাখতে পারে। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বেইজিং ও মস্কো সফর নতুন বার্তা দিয়েছে। চীন, রাশিয়া ও ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সমন্বিতভাবে কৌশল নির্ধারণ করছে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর আরাগচির ভারত সফর ও ব্রিকস বৈঠকে অংশ নেওয়াও সেই বড় ভূরাজনৈতিক জোট রাজনীতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
চীনের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, বেইজিং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়ে ধীর কিন্তু স্থায়ী অগ্রগতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনের সাম্প্রতিক পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট প্রযুক্তি, মহাকাশ যোগাযোগ ও আধুনিক শিল্প উৎপাদনকে কেন্দ্রীয় জায়গায় রাখা হয়েছে। চীনের লক্ষ্য আগামী এক দশকের মধ্যে অর্থনীতির বড় অংশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিশ্চিত করা।
এখানে আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ। আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, যুদ্ধ সরঞ্জাম ও চিপ তৈরির জন্য এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খনিজের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে। ফলে আমেরিকা চাইলেও পুরোপুরি অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারছে না। উল্টো মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এখন চীনা বাজার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর নিয়েও দুই দেশের লড়াই এখন স্পষ্ট। ওয়াশিংটন চীনের প্রযুক্তি অগ্রগতি থামাতে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দিলেও বেইজিং নিজস্ব প্রযুক্তি উৎপাদনে বড় বিনিয়োগ করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কয়েক বছর আগের তুলনায় এখন চীন অনেক বেশি আত্মনির্ভর অবস্থানে পৌঁছে গেছে। ফলে মার্কিন চাপ আগের মতো কার্যকর থাকছে না।
তাইওয়ান প্রশ্নও এই সফরের কেন্দ্রীয় ইস্যুগুলোর একটি ছিল। চীন স্পষ্টভাবে আবারও জানিয়েছে, তাইওয়ান তাদের রেড লাইন। আমেরিকা তাইওয়ানকে অস্ত্র সহায়তা অব্যাহত রাখলেও বেইজিং এটিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন এখন সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে তাইওয়ানকে নিজেদের দিকে টানার কৌশল নিচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সফর শেষে দুই দেশ আলাদা বিবৃতি দিয়েছে ও দুই বিবৃতির ভাষাতেও বড় পার্থক্য ছিল। সাধারণত বড় কূটনীতিক সাফল্যের ক্ষেত্রে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে সেটি হয়নি। এ কারণেই অনেক বিশ্লেষক বলছেন, সফরে সম্পর্কের উত্তেজনা কিছুটা কমলেও কোনো বড় সমঝোতা হয়নি।
তাহলে আমেরিকার অর্জন কী? বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প অন্তত এটুকু নিশ্চিত করতে চেয়েছেন যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়বে না। মার্কিন কৃষক, বোয়িংসহ বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজার খোলা রাখা ছিল সফরের সবচেয়ে বাস্তব অর্জন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন বুঝেছে, চীনকে একঘরে করা এখন আর সহজ নয়।
অন্যদিকে চীন এই সফরের মাধ্যমে দেখিয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে তাদের অবস্থান এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে আমেরিকাকেও দরকারে বেইজিংয়ের দরজায় কড়া নাড়তে হয়। আর সেই কারণেই অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের চোখে এই সফর ছিল শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে বাস্তবতার স্বীকারোক্তি বেশি। আমেরিকা যে আর একাই চালকের আসনে নেই, এই সত্যটা এই সফরে প্রকাশ হয়ে গেছে।