দেশভাগের প্রায় আশি বছর পর পাকিস্তানের লাহোরের রাস্তাঘাটগুলো তাদের ইসলামীকরণ করা পরিচিতি ঝেড়ে ফেলে আবার আগের হিন্দু, শিখ, জৈন ও ঔপনিবেশিক আমলের নামে ফিরে যাচ্ছে। এখন সেখানকার সরকারি সাইনবোর্ডগুলোতে ইসলামপুরার জায়গায় শোভা পাচ্ছে কৃষ্ণ নগর, বাবরি মসজিদ চক তার আগের জৈন মন্দির চক নাম ফিরে পেয়েছে আর রহমান গলির নাম বদলে করা হয়েছে রাম গলি।
এনডিটিভি জানিয়েছে, গত দুই মাসে লাহোরের কমপক্ষে নয়টি জায়গার নাম বদলে ফেলা হয়েছে। আরও অনেক জায়গাকে তাদের পুরোনো ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
নাম পরিবর্তনের নেপথ্যে যারা
রাস্তাঘাটের নাম পরিবর্তনের এই পদক্ষেপ আসলে পাকিস্তানের পাঞ্জাব সরকারের একটি বড় প্রকল্পের অংশ, যার নাম ‘লাহোর হেরিটেজ এরিয়া রিভাইভাল’। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য, দেশটির সাংস্কৃতিক রাজধানীকে দেশভাগ-পূর্ব ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
কয়েক দশকের অবহেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আদর্শিক পুনর্লিখনের (কোনো রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতাদর্শের সঙ্গে মিলিয়ে ইতিহাস, সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যকে নতুন করে লেখে বা বদলে ফেলে) পর লাহোরের স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে পুনরুজ্জীবিত করতে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ৫০ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপির এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নেন।
২০২৫ সালে নওয়াজ শরিফ এবং তার মেয়ে পাঞ্জাব প্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ যৌথভাবে এই কাজ শুরু করেন।
সরকারের যুক্তি হলো, ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো পাকিস্তানেরও উচিত তাদের শহরগুলোর ঐতিহাসিক ঐতিহ্য মুছে না ফেলে তা সংরক্ষণ করা। আর এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, হেরিটেজ ট্যুরিজম বা ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের প্রসার ঘটানো, যা সরকারের জন্য রাজস্ব আয়ের বড় উৎস হবে।
নাম পরিবর্তনের মূল কারণ
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দেশভাগের পর পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে হিন্দু ও শিখদের দুরাবস্থা গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাদের ওপর নির্যাতন, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, সম্পত্তি দখল ও ঐতিহাসিক মন্দির ভেঙে ফেলার মতো ঘটনাগুলো আশঙ্কাজনকভাবে নিয়মিতই সংবাদে উঠে আসে।
তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, কয়েক দশকের ইসলামীকরণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি দেশে রাস্তাঘাটের এই নাম পরিবর্তনের অভিযানের বিরুদ্ধে তেমন কোনো সুসংগঠিত প্রতিরোধ বা বিরোধিতা দেখা যায়নি।
পুরোনো নামগুলো ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে পাকিস্তান আসলে বিশ্ব সম্প্রদায়কে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোকে দেখাতে চাইছে, তারা তাদের ‘চরমপন্থী ভাবমূর্তি’ ঝেড়ে ফেলে একটি সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বহুত্ববাদী জাতি হিসেবে গড়ে উঠছে।
এর আসল উদ্দেশ্য, আন্তর্জাতিক মহলের কাছ থেকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য পাওয়ার পথ সহজ করা।
সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের অভিযোগে পাকিস্তানকে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক স্তরে কঠোর নজরদারিতে থাকতে হয়েছে, যার খেসারত হিসেবে দেশটির অর্থনীতিকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হারাতে হয়েছে।
লাহোরের মতো একটি প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ঔপনিবেশিক বা পুরোনো আমলের নামগুলো ফিরিয়ে এনে পাকিস্তান বিশ্ব দরবারে এই বয়ান তৈরি করতে চাইছে, তারা উগ্রপন্থাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে।
এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স বা অন্য কোনো বৈশ্বিক সংস্থা যেন তাদের ওপর আবারও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে না পারে।
পাশাপাশি টিকে থাকার জন্য ইসলামাবাদ অনেকাংশে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। আইএমএফ কেবল কোনো দেশের অর্থনৈতিক উপাত্তই যাচাই করে না, সেই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক পরিস্থিতির ওপরও কড়া নজর রাখে।