রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আবারও বেইজিংয়ে স্বাগত জানাতে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এমন এক সময় এই সফর হচ্ছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, তাইওয়ান সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে চীন নিজেকে দায়িত্ববান বিশ্বশক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে পুতিনের মতো আলোচিত নেতাকে প্রকাশ্যে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পাশে রাখা কি শি জিনপিংয়ের সেই কূটনীতিক ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করছে, নাকি উল্টো চীনের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন এক জটিল ভারসাম্যের রাজনীতি খেলছে। একদিকে বেইজিং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ ও শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চায়। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে মস্কোর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ভরসাগুলোর একটি এখন চীন। বিশেষ করে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য খাতে দুই দেশের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
চীনা গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় কূটনীতিক ভাষ্যে রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে সীমাহীন অংশীদারত্ব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। পুতিন সফরের আগে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, রাশিয়া ও চীন একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করতে সবসময় প্রস্তুত। তার দাবি, দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা এখন অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শি জিনপিংয়ের সামনে এখন দুটি বড় লক্ষ্য কাজ করছে। প্রথমত, তিনি বিশ্বকে বোঝাতে চান যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের বাইরে বিকল্প শক্তিকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে, যার কেন্দ্র হতে পারে চীন। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বেইজিংকে একটি স্থিতিশীল ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তুলে ধরা। পুতিনের সফর সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করছে।
তবে পশ্চিমা দেশগুলোর চোখে বিষয়টি এতটা ইতিবাচক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, ইউক্রেন যুদ্ধে চীন সরাসরি অস্ত্র না দিলেও রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে। বিশেষ করে রুশ তেল ও গ্যাস কেনার মাধ্যমে মস্কোর যুদ্ধ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে বেইজিং। যদিও চীন বারবার দাবি করেছে, তারা যুদ্ধের কোনো পক্ষ নয় এবং শান্তি আলোচনার পক্ষে অবস্থান করছে।
এদিকে পুতিনের এই সফর আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের পরপরই পুতিন বেইজিং যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিক অঙ্গনে এটি একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিং বোঝাতে চাইছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালালেও বেইজিং তার পুরনো কৌশলগত মিত্রদের থেকে সরে আসছে না।
চীন-রাশিয়া সম্পর্কের আরেকটি বড় দিক হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২ গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে দুই দেশের আলোচনা আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। রাশিয়া চাইছে ইউরোপের বাজার হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চীনে আরও বেশি গ্যাস রপ্তানি করতে। অন্যদিকে চীনও মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করতে আগ্রহী। তবে মূল্য ও শর্ত নিয়ে এখনও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, শি জিনপিং এখন বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গঠনের ধারণাকে সামনে আনছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একক আধিপত্য হারাবে এবং চীন, রাশিয়া, ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো জোটগুলো বড় ভূমিকা নেবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের কূটনীতিক ভাষ্যেও সেই বার্তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, পুতিনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা চীনের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা এলে চীনের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও চাপ বাড়তে পারে। একইসঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পুতিনকে আতিথ্য দেওয়া এখন শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক সফর নয়, বরং এটি নতুন বিশ্বরাজনীতির শক্তির ভারসাম্য, জোট রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা নিয়েও বড় এক কূটনৈতিক বার্তা হয়ে উঠেছে।
সূত্র: ডব্লিউআইওএন নিউজ, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, লে মঁদ