যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ চিরদিন চলবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়াতে চায় না। হোয়াইট হাউসে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছানো। একইসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, ওয়াশিংটন এখনও কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
হোয়াইট হাউসের ওই ব্রিফিংকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের ফলে তেলের বাজারে ধাক্কা লাগে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্তহীন যুদ্ধ চায় না। তার ভাষায়, আমেরিকার লক্ষ্য নির্দিষ্ট এবং সীমিত। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত আছে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন এক ধরনের দ্বৈত কৌশল অনুসরণ করছে। একদিকে সামরিক চাপ ধরে রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কিছুটা কমেছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রশাসন দ্রুত যুদ্ধের সমাপ্তির বার্তা দিতে চাইছে।
এর আগে ট্রাম্প নিজেও বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুবই দ্রুত ইরান থেকে বের হয়ে আসতে চায়। তবে তিনি এটাও ইঙ্গিত দেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে আবার হামলা চালানো হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। ইরান সতর্ক করেছে, নতুন হামলা হলে নতুন ফ্রন্টও খুলে যেতে পারে। একইসঙ্গে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন এখনও কিছু রুটে ফ্লাইট সীমিত রেখেছে।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তেলের দাম ওঠানামা করছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং বহু দেশ তাদের কৌশলগত জ্বালানি মজুত ব্যবহার শুরু করেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার সম্ভাবনার খবরে তেলের দাম কিছুটা কমেছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ আবার যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযানের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া ইরানে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, এই অভিযান ছিল আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ।
সব মিলিয়ে, হোয়াইট হাউস এখন একদিকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেখাতে চাইছে, অন্যদিকে বিশ্বকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে ইরান সংঘাত নতুন আফগানিস্তান বা ইরাক যুদ্ধে পরিণত হবে না। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, ইকোনমিক টাইমস, রয়টার্স বিশ্লেষণ