জাফনার জঙ্গল থেকে বিশ্বরাজনীতি। ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। একটি নাম। একটি ইতিহাস। তামিল টাইগারদের উত্থান-পতনের এক অবিস্মরণীয় গল্প। গায়ে কাটা দিয়ে উঠা সেই ইতিহাস আবারও সামনে এলো।
শ্রীলঙ্কার তামিলদের অধিকারের প্রশ্নে আবারও আলোচনায় এসেছে তার নাম: ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী ও অভিনেতা বিজয় থালাপতির মুখে সম্প্রতি তামিল গেরিলা নেতা প্রভাকরণের নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ এতদঞ্চলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ প্রয়াত গেরিলা নেতা প্রভাকরণকে স্বাধীনতার যোদ্ধা বলছেন, কেউ বলছেন ভয়ংকর গেরিলা নেতা, আবার কেউ সন্ত্রাসবাদের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরছেন। প্রায় দেড় দশক আগে মৃত্যু হলেও প্রভাকরণ নামটি এখনও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বিস্ফোরক স্মৃতি।
ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৪ সালের ২৬ নভেম্বর, শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের উপকূলীয় শহর ভেলভেত্তিতুরাইয়ে। বাবা-মায়ের চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোট। ছোটবেলায় তিনি খুব বেশি মিশুক ছিলেন না। বই পড়া, ইতিহাস জানা আর নিঃশব্দে পর্যবেক্ষণ করাই ছিল তার অভ্যাস। পরবর্তীতে তার ঘনিষ্ঠরা দাবি করেন, কৈশোর থেকেই তিনি শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে তামিলদের প্রতি বৈষম্য অনুভব করতেন। বিশেষ করে ভাষানীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোটা এবং সরকারি চাকরিতে সিংহলি আধিপত্য তাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
১৯৫৬ সালে সিংহলা অনলি অ্যাক্ট পাস হওয়ার পর শ্রীলঙ্কায় ভাষাভিত্তিক বিভাজন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তামিলদের মধ্যে ধীরে ধীরে এই ধারণা জন্ম নেয় যে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। ষাট ও সত্তরের দশকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনও কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ায় একাংশের মধ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের চিন্তা জন্ম নিতে শুরু করে। সেই সময়ের তরুণ প্রভাকরণ নিজেকে ইতিহাসের বিপ্লবীদের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। তিনি বলেছিলেন, সুভাষচন্দ্র বসু ও ভগত সিং তার রাজনৈতিক চিন্তাকে প্রভাবিত করেছেন। একইসঙ্গে আলেকজান্ডার ও নেপোলিয়নের সামরিক কৌশল নিয়েও তার গভীর আগ্রহ ছিল।
ধারণা করা হয়, ১৯৭৩ অথবা ১৯৭৪ সালে তিনি তামিল নিউ টাইগার্স নামে একটি গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন। পরে সেটিই লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম বা এলটিটিই নামে পরিচিত হয়। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীন তামিল ইলম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। শুরুতে ছোট আকারের গেরিলা হামলা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় তারা।
১৯৭৫ সালে জাফনার মেয়র আলফ্রেড দুরাইয়াপ্পাহকে হত্যার অভিযোগ ওঠে প্রভাকরণের বিরুদ্ধে। এই হত্যাকাণ্ডকে এলটিটিইর প্রথম বড় রাজনৈতিক অভিযান হিসেবে ধরা হয়। এর পর ধীরে ধীরে সংগঠনটি তামিল তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। আশির দশকে শ্রীলঙ্কাজুড়ে যখন জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে ১৯৮৩ সালের ব্ল্যাক জুলাই দাঙ্গায় হাজার হাজার তামিল নিহত ও বাস্তুচ্যুত হন, তখন বহু তরুণ এলটিটিইতে যোগ দেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ওই দাঙ্গাই গৃহযুদ্ধকে পূর্ণমাত্রায় বিস্ফোরিত করে।
প্রভাকরণের নেতৃত্বে এলটিটিই দ্রুত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সংগঠিত গেরিলা বাহিনীগুলোর একটিতে পরিণত হয়। তাদের নিজস্ব নৌ ইউনিটের নাম সি টাইগার্স, আত্মঘাতী ইউনিটের নাম ব্ল্যাক টাইগার্স, এমনকি ছোট আকারের বিমান ইউনিটও ছিল। নারীদেরও বড় সংখ্যায় যুদ্ধে যুক্ত করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী তামিলদের কাছ থেকে বিপুল অর্থসহায়তা আসতে থাকে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এলটিটিই ছিল বিশ্বের অন্যতম দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর গেরিলা সংগঠন।
কিন্তু সংগঠনটির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভয়াবহ সহিংসতাও। আত্মঘাতী হামলাকে সংগঠিত কৌশল হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এলটিটিইকে আদর্শ মানদণ্ড ধরা হয়। ১৯৯১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন। ভারতীয় তদন্তে এলটিটিইকে দায়ী করা হয়। ধারণা করা হয়, শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। এরপর ভারত সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরও কয়েকটি দেশ এলটিটিইকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
১৯৯৬ সালে কলম্বো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আত্মঘাতী ট্রাক হামলায় ৯০ জন নিহত এবং হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। এটি ছিল এলটিটিইর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি। একই সময়ে সংগঠনটির বিরুদ্ধে শিশু যোদ্ধা নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা এবং বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার অভিযোগও বাড়তে থাকে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একাধিকবার এলটিটিই ও শ্রীলঙ্কা, উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলে।
তবে বহু তামিলের কাছে প্রভাকরণ ছিলেন আত্মপরিচয় রক্ষার প্রতীক। জাফনা ও উত্তর শ্রীলঙ্কার বহু পরিবার এখনও মনে করে, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস তিনি দিয়েছিলেন। এলটিটিই নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিজেদের প্রশাসন, আদালত, পুলিশ ও কর ব্যবস্থাও চালু করেছিল সংগঠনটি। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে শ্রীলঙ্কার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
২০০২ সালে নরওয়ের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো রক্তাক্ত সংঘাতের অবসান আসছে। কিন্তু অবিশ্বাস, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক সংকটের কারণে সেই আলোচনা ভেঙে পড়ে। ২০০৬ সালের পর শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। একে একে এলটিটিইর ঘাঁটিগুলো পতন হতে থাকে। ২০০৯ সালের শুরুতে কিলিনোচ্চি ঘাঁটি হারানোর পর সংগঠনটি কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
২০০৯ সালের মে মাসে শ্রীলঙ্কার সরকার ঘোষণা দেয়, প্রভাকরণ নিহত হয়েছেন এবং ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছে। মুল্লাইতিভুর উপকূলীয় এলাকায় চূড়ান্ত লড়াইয়ে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কার কথা বলা হয়। তবে কলম্বো সরকার সবসময়ই বড় ধরনের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
প্রভাকরণের মৃত্যু এলটিটিইর সামরিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেও তার রাজনৈতিক ও আবেগিক উপস্থিতি শেষ হয়নি। আজও তামিল প্রবাসী সমাজের লোকজন তাকে শহীদ নেতা হিসেবে স্মরণ করে। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে ‘মাভীরার নাল’ বা বীরযোদ্ধা দিবসে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাকে স্মরণ করা হয়। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি সমাজের বড় অংশের কাছে তিনি রক্তাক্ত সন্ত্রাসের প্রতীক।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাকরণ একটি বিভক্ত স্মৃতিতে পরিণত হয়েছেন। ইতিহাসের এক অংশ তাকে স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বলে মনে রাখে, আরেক অংশ তাকে নির্মম গেরিলা নেতা হিসেবেই দেখে। কিন্তু এটুকু নিয়ে খুব কম মানুষেরই দ্বিমত আছে, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এলটিটিই এবং ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ এমন এক অধ্যায়, যাকে মুছে ফেলা যায়নি। প্রভাকরণের প্রভা এখনো জ্বলজ্বল করে জ্বলে মুক্তিকামী তামিলদের বুকে।