যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখা লাখো অভিবাসীর জন্য বড় ধাক্কা নিয়ে এলো ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নীতিতে বলা হয়েছে, এখন থেকে গ্রিন কার্ড পেতে ইচ্ছুক অধিকাংশ বিদেশিকে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন করতে হবে। অর্থাৎ এতদিন যেভাবে অনেকে শিক্ষার্থী, পর্যটক বা অস্থায়ী কাজের ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারতেন, সেই সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সংস্থা শুক্রবার জানায়, একেবারে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া আর কাউকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকে অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হবে না। আবেদনকারীদের বিদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের দাবি, বহু মানুষ অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে পরে সেখানেই থেকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নতুন নিয়ম সেই ফাঁকফোকর বন্ধ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের যুগ শেষ। এখন থেকে সবাইকে নিয়ম মেনেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।’
সংস্থাটির মুখপাত্র জ্যাক কালার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ কখনোই গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রথম ধাপ হওয়া উচিত নয়। তার দাবি, মানুষ যদি নিজ দেশে থেকেই আবেদন করে, তাহলে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার প্রবণতাও কমবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশটিতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা এই পদ্ধতি পরিবারগুলোকে একসঙ্গে থাকতে সাহায্য করত। এখন অনেক মানুষকে হয়তো স্ত্রী, স্বামী বা সন্তানদের ফেলে নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। সবচেয়ে বড় ভয় হলো, যারা যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাবেন, তাদের কেউ কেউ হয়তো আর ফিরে আসতেই পারবেন না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু কাগজে-কলমে নিয়ম পরিবর্তন নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাকেই কঠোর করে তোলার বড় রাজনৈতিক বার্তা। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এক মিলিয়নের বেশি বৈধ অভিবাসী গ্রিন কার্ডের জন্য অপেক্ষা করছেন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাদের অনেকের জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
সাবেক জ্যেষ্ঠ অভিবাসন কর্মকর্তা মাইকেল ভালভার্দে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত লাখো পরিবার ও নিয়োগদাতার পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দেবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকা মানুষদেরও এখন নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় মেয়াদে এসে অভিবাসন নীতিকে আরও কঠোর করেছে। এর আগেও বাংলাদেশসহ বহু দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা, বহিষ্কার অভিযান ও বিদেশিদের ওপর নজরদারি, সব ক্ষেত্রেই কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করছে, নতুন নিয়মের ফলে বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। কেউ কেউ বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থেকেও হঠাৎ দেশ ছাড়তে বাধ্য হবেন। আবার আবেদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে চাকরি, পড়াশোনা বা পারিবারিক জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকবেন তারা, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার পর আবেদন বাতিল হলে বা দীর্ঘসূত্রতায় পড়লে তারা আবার প্রবেশের সুযোগ নাও পেতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ভিসা পাওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত নমনীয় ছিল। নতুন নিয়ম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে এবং অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতারও অংশ। ট্রাম্প আবারও অভিবাসন ইস্যুকে নিজের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। আর সেই নীতির প্রভাব এখন সরাসরি পড়তে যাচ্ছে লাখো অভিবাসীর জীবনে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, সিবিএস নিউজ, রয়টার্স, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সংস্থা