লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। ভেনেজুয়ায় সামরিক অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর এবার কিউবার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। ওয়াশিংটনে এখন প্রকাশ্যেই আলোচনা হচ্ছে, ভেনেজুয়ায় যা হয়েছে, কিউবাতেও কি সেটি সম্ভব? কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশ বলছেন, কিউবা কখনো ভেনেজুয়েলা হবে না। একই ধরনের চাপ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক ভয় দেখিয়ে হাভানাকে নত করা এত সহজ হবে না।
রয়টার্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে কিউবাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললে দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে কিউবার রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক আলাদা।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়। এরপর দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব নেন। ওয়াশিংটন দ্রুত সেই পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়। কিন্তু কিউবায় এমন কোনো দৃশ্যমান বিকল্প নেতৃত্ব নেই। প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলের পর কে আসবেন, সেটিও স্পষ্ট নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিউবায় বহু বছর ধরেই সম্ভাব্য সব বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিকে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-লাতিন আমেরিকা সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অরল্যান্ডো পেরেজ বলেছেন, কিউবার নিরাপত্তা কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ক্ষমতার বাইরে কোনো সমান্তরাল শক্তি দাঁড়াতে না পারে।
ভেনেজুয়েলায় মারিয়া কোরিনা মাচাদোর মতো জনপ্রিয় বিরোধী নেতা আছেন, যিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। কিন্তু কিউবায় তেমন কোনো শক্তিশালী বিরোধী নেতৃত্ব নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করেও, ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো বাস্তব রাজনৈতিক মঞ্চ সেখানে তৈরি নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এটিই কিউবাকে ভেনেজুয়েলা থেকে সবচেয়ে বেশি আলাদা করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সাবেক কিউবান নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করা হয়েছে। অভিযোগ, ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তাবাহী বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় তার ভূমিকা ছিল। যদিও কিউবা এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিউবার সরকার বলছে, এটি মূলত হাভানার ওপর নতুন করে চাপ তৈরির কৌশল।
এর মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর নাম। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান জন র্যাটক্লিফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। এতে জল্পনা শুরু হয়, কিউবার ক্ষমতাকেন্দ্রের ভেতরে কি কোনো ভাঙন তৈরি হচ্ছে? তবে বিশ্লেষকদের মতে, তিনি সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই এবং কাস্ত্রো পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনাও খুব কম।
কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতার ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক শত্রুতাপূর্ণ। শীতল যুদ্ধের সময় কিউবা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ মিত্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও কিউবা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান বদলায়নি। বরং কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও দেশটি টিকে আছে। এখনো ফ্লোরিডাভিত্তিক কট্টর কিউবান-আমেরিকান গোষ্ঠী ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কিউবায় সরকার পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজেও দীর্ঘদিন ধরে কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে।
তবে বাস্তবতা হলো, কিউবার অর্থনীতি এখন ভয়াবহ সংকটে। জ্বালানি ঘাটতি, দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, খাদ্য সংকট এবং পর্যটন খাতের পতনে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে আছে। ভেনেজুয়েলা থেকে তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মেক্সিকোর ওপরও চাপ দিয়েছে, যেন তারা কিউবায় তেল পাঠানো বন্ধ করে। ফলে দেশটিতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি প্রায় ভেঙে পড়েছে। অনেক এলাকায় দিনে ২০ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না।
কিন্তু এই সংকট সত্ত্বেও কিউবার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো এখনো শক্ত অবস্থানে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউবার সামরিক বাহিনী আদর্শগতভাবে অনেক বেশি সংগঠিত এবং রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত। ভেনেজুয়েলায় সেনাবাহিনীর ভেতরে বিভক্তি ছিল, কিন্তু কিউবায় এখনো তেমন দৃশ্য দেখা যায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ প্রতিরোধে তারা প্রস্তুত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো, কিউবার গোয়েন্দা সক্ষমতা। রাশিয়া ও চীনের সহায়তায় বহু বছর ধরে তারা একটি শক্তিশালী নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে কিউবার আকাশসীমার আশপাশে যুক্তরাষ্ট্র শতাধিক নজরদারি উড়োজাহাজ অভিযান চালিয়েছে। এর মাধ্যমে কিউবার সামরিক অবস্থান, সমুদ্রপথ এবং নেতৃত্বের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তবে কিউবাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভয় শুধু রাজনীতি নয়; সম্ভাব্য শরণার্থী সংকটও। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কিউবায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করতে পারে। অতীতেও এমন হয়েছে। ১৯৮০ সালের মারিয়েল নৌ-অভিবাসন সংকটে এক লাখের বেশি কিউবান যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিল। এখনকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কিউবার অর্থনীতি পুরোপুরি রাষ্ট্র ও সামরিক নিয়ন্ত্রিত। গায়েসা নামের সামরিক ব্যবসায়িক জোট দেশটির বড় হোটেল, ব্যাংক, বন্দর, সুপারশপ এবং অর্থনৈতিক খাত নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও দ্রুত অর্থনৈতিক রূপান্তর সম্ভব হবে না। ভেনেজুয়েলায় বড় বেসরকারি অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল, যা বিকল্প ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিউবায় সেটি নেই।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো আইনি বাধা। ১৯৯৬ সালের হেলমস-বার্টন আইন অনুযায়ী, কিউবায় গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলতে পারবে না। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন চাইলেও ভেনেজুয়েলার মতো দ্রুত রাজনৈতিক সমঝোতা করতে পারবে না।
কিউবা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে। বরং দেশটি দাবি করছে, তারা বহু বছর ধরেই মাদক পাচার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সীমিত সহযোগিতা করেছে। ভেনেজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপকে ওয়াশিংটন মাদকবিরোধী অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। কিন্তু কিউবার ক্ষেত্রে সেই যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ওপর যতই চাপ বাড়াক, হাভানাকে ভেনেজুয়েলার মতো দ্রুত গুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ কিউবার রাষ্ট্রীয় কাঠামো অনেক বেশি কেন্দ্রীয়, দীর্ঘমেয়াদি এবং আদর্শভিত্তিক। তবে অর্থনৈতিক সংকট যদি আরও গভীর হয়, তাহলে দেশটির ভেতরে সামাজিক অসন্তোষ বাড়তে পারে। আর সেটিই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে দুর্বল করতে চাইছে, অন্যদিকে কিউবা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও বিপ্লবের উত্তরাধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রতিরোধের কথা বলছে। ফলে ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই দ্বন্দ্ব এখন শুধু দুই দেশের সংঘাত নয়; এটি আবারও নতুন এক ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে যেখানে চীন ও রাশিয়াও শামিল আছে।