মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার দিনেও গাজায় থামেনি যুদ্ধ। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বাহিনীর গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় অন্তত ৩৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও শতাধিক মানুষ। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। ঈদের দিন নতুন কাপড় নয় ৩৩ ফিলিস্তিনিকে পরাতে হলো নতুন কাফন।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে গাজা সিটি, খান ইউনুস এবং মধ্য গাজার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর আশপাশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বহু পরিবার ঈদের নামাজ আদায় বা খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করার সময় হামলার মুখে পড়ে। ফলে উৎসবের আনন্দের পরিবর্তে শোক ও আতঙ্কে কাটছে গাজার মানুষের দিন।
ফিলিস্তিনি চিকিৎসা সূত্রের বরাত দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নিহতদের একটি অংশ ত্রাণ সংগ্রহের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে ছিলেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে খাদ্য ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোর আশপাশে বারবার প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা হামাসের সামরিক স্থাপনা ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। বেসামরিক হতাহতের জন্য তারা হামাসকে দায়ী করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় চলমান হামলার কারণে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ক্রমেই বাড়ছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, গাজায় মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক হাসপাতাল সীমিত সক্ষমতায় কাজ করছে, আবার কিছু হাসপাতাল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, আহত মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গাজায় ত্রাণ প্রবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিভিন্ন মানবিক সংস্থা অভিযোগ করেছে, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম সহায়তা উপত্যকায় প্রবেশ করতে পারছে। ফলে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, লাখ লাখ মানুষ এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে এবং বহু শিশু অপুষ্টির ঝুঁকিতে আছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ৫৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছেন এক লাখেরও বেশি মানুষ। অধিকাংশ আবাসিক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং উপত্যকার প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। কাতার, মিসর এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
গাজার এক বাসিন্দা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ঈদের দিনে নতুন কাপড়, কোরবানি বা আনন্দের কথা ভাবার সুযোগ নেই। আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো বেঁচে থাকা এবং সন্তানদের নিরাপদ রাখা। এই কথাই আজকের গাজার বাস্তবতাকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
যখন বিশ্বের মুসলমানরা ঈদের আনন্দে মেতে উঠেছেন, তখন গাজার বহু পরিবার প্রিয়জনের লাশ দাফন, খাবারের সন্ধান এবং নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিন কাটাচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে ঈদ আবারও পরিণত হয়েছে শোক, অনিশ্চয়তা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামে।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, রয়টার্স, আল জাজিরা, জাতিসংঘ মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা