এক মাসের মধ্যে প্রায় চার হাজার ৮০০ জন সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘ওপারে’ (বাংলাদেশে) পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আরও ৮৬৩ জন এখন রাজ্যের বিভিন্ন ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ আটক আছেন, যাদের নথি যাচাই করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলছে। তবে ঠিক কতজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, বা কতজন নানা হোল্ডিং সেন্টারে আটক আছেন, তা নিয়ে এই প্রথম আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি বক্তব্য পাওয়া গেল।
শুভেন্দু অধিকারী আরও জানান, যে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে, তাদেরও দ্রুত ডিপোর্ট করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
একটি দলীয় কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্য সরকারের সীমান্ত সুরক্ষা ও অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ-সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলির কথা তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী। তার দাবি, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে রাজ্য সরকার।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সব চেয়ে বড়ো ইস্যু ছিল সীমান্ত সুরক্ষা, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। সিএএ-এর আওতায় যারা পড়েননি, সেই ধরনের অনুপ্রবেশকারীদের ডিপোর্ট করার কাজ নিয়ম মেনে শুরু করেছি। একটি আইন ছিল ভারত সরকারের, সেই আইনে তাদের জেলে না পাঠিয়ে সরাসরি বিএসএফের হাতে হ্যান্ডওভারের আইন ছিল।’
শুভেন্দু অধিকারী জানান, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বিশেষ হোল্ডিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের অস্থায়ীভাবে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে ধাপে ধাপে তাদের ডিপোর্ট করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এবারে সরাসরি হোল্ডিং স্টেশন বানানো হয়েছে বর্ডারের জেলাগুলিতে। সেখান থেকে এখনো অবধি চার হাজার ৮০০ জনকে ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এখন হোল্ডিং সেন্টারে আছেন ৮৩৬ জন। তাদেরকেও আমরা তাড়াতাড়ি খাইয়ে পরিয়ে ওদিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। এই প্রক্রিয়া চলবে।’
‘সীমান্ত রক্ষা অগ্রাধিকার’
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত সুরক্ষা ও রাজ্য থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বিজেপি সরকার। প্রশাসনের দাবি, সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে রাজ্যে প্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
চলতি বছরের মে মাসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ বিষয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, যারা ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে এসেছেন কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) আওতায় পড়েন না, তারা পুরোপুরি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী।
এই আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত যেসব মানুষ ২০২৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসেছেন, তারা ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ এই আইনের আওতায় পড়েন না।
তিনি জানিয়েছিলেন, যেসব কথিত অনুপ্রবেশকারী এই আইনের আওতায় পড়েন না এবং অবৈধভাবে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছেন, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। বিএসএফ বিজিবির সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে ডিপোর্ট করার ব্যবস্থা করবে। অর্থাৎ ডিটেক্ট, ডিলিট, এবং ডিপোর্ট।
এই আবহেই দিল্লিতে সোমবার থেকে শুরু হয়েছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক। বৈঠকে পুশ-ইন-এর বিষয়টি উঠতে পারে। চার দিন ধরে চলবে এই বৈঠক।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের ক্যাবিনেট মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া বলেন, ‘এই চার হাজার ৮০০ জন অনুপ্রবেশকারী ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ পৌঁছে গিয়েছেন। অনেকে স্বেচ্ছায় গিয়েছেন। বিভিন্ন দপ্তরের কাছে খবর থাকে কোথায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা লুকিয়ে আছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পুলিশ প্রশাসন বা রাজ্য প্রশাসনকে এতদিন কাজ করতে দেওয়া হয়নি। এখন পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করছে তারা অনেকেই নিজে থেকেই বলছেন তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন এবং বাংলাদেশেই ফিরে যেতে চান।’
তিনি আরও বলেন, ‘অসংখ্য অনুপ্রবেশকারী এখনো পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভিড়ে লুকিয়ে আছেন এবং রাজ্যের আর্থিক ফেসিলিটি ব্যবহার করে জীবন যাপন করছেন। অনুপ্রবেশকারী এবং শরণার্থী আলাদা। অনুপ্রবেশকারী হলেন তারা যারা ১৯৪৭ সালের পর হিন্দুদের সঙ্গে থাকতে না চেয়ে ভারতবর্ষে আসেননি বা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আজ তারা দেশের সীমান্ত পেরিয়ে তাদের জীবন জীবিকার জন্য আবার ভারতের জল, জমি, খাদ্যে ভাগ বসাচ্ছেন। তাদের পশ্চিমবঙ্গে কোনো স্থান নেই।’
অশোক কীর্তনিয়ার দাবি, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায়, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য নির্ধারিত সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছিলেন। গত ১৫ বছরে রাজ্যে প্রচুর অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এসে ঠাঁই করেছেন। বাম জমানাতেও অনেক অনুপ্রবেশকারী অবৈধ ভাবে রাজ্যে এসেছেন। আমরা এখন তিলে তিলে এই সমস্যার সমাধান করছি। দেশের আইন অনুযায়ী, অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেফতার করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।’
উদ্বিগ্ন মানবাধিকার কর্মীরা
এই ব্যাপক পুশব্যাকের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, যেভাবে লোকজনকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তা মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারে।
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটসের (এপিডিআর) সহ-সভাপতি রঞ্জিত শূর প্রশ্ন তুলছেন, ‘আমরা জানতে চাই পুশব্যাক হওয়া এই চার হাজার ৮০০ জন কারা? পাইপলাইনে থাকা ৮০০ জনই বা কারা? কী তাদের নাম ধাম পরিচয়? শ্বেতপত্র প্রকাশ করে সত্য জানাক সরকার। সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে ভারতের মানুষের এদের নাম-পরিচয় জানার অধিকার আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হল, আদালতে পেশ না করে কাউকে ২৪ ঘন্টার বেশি আটক রাখা যাবে না। তাহলে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে দিনের পর দিন হোল্ডিং সেন্টারে আটক রাখা হচ্ছে কী করে? আদালতের নির্দেশ ছাড়া সরকার কাউকে বিদেশি নাগরিক বলতেই পারে না।’