ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার একদিন পর লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রোকে সরাসরি হুমকি দিয়েছেন। এবং দাবি করেছেন, কিউবার সরকারও শিগগিরই পতনের মুখে পড়তে পারে। খবর আল-জাজিরার।
রোববার (৪ জানুয়ারি) রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা খুবই রুগ্ন। কলম্বিয়াও তাই। দেশটি একজন অসুস্থ ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যিনি কোকেন উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করেন। তিনি আর বেশিদিন এটা করতে পারবেন না।’
কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমার কাছে শুনতে ভালোই লাগছে।’
কিউবার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নাও হতে পারে, কারণ সরকার নিজেরাই ভেঙে পড়ার অবস্থায় রয়েছে। তার ভাষায়, ‘কিউবা পতনের জন্য প্রস্তুত। তাদের কোনো আয় নেই। ভেনেজুয়েলার তেল থেকেই তারা সব আয় পেত। এখন সেটাও বন্ধ। কিউবা আক্ষরিক অর্থেই ধসের মুখে।’
এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কিউবান-আমেরিকানদের কথা উল্লেখ করে বলেন, কিউবার বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা খুশি হবেন।
এর একদিন আগে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আকস্মিক অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ফোর্স ডেল্টা। সোমবার তাদের নিউইয়র্কে মাদক–সংক্রান্ত মামলায় আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেন, এখন ভেনেজুয়েলার ‘দায়িত্বে’ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা যদি অনুগত ‘আচরণ না করে’, তাহলে আবারও মার্কিন সেনা পাঠানো হতে পারে বলেও হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এ ছাড়া মেক্সিকোকে সতর্ক করে তিনি বলেন, দেশটিকে ‘নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিতে হবে’, কারণ মাদক মেক্সিকোর ভেতর দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউমকে তিনি ‘অসাধারণ ব্যক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্প জানান, তিনি একাধিকবার মেক্সিকোতে মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, মেক্সিকো সরকার সমস্যা সমাধানে সক্ষম হলেও দেশটিতে মাদক কার্টেলগুলো ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘পছন্দ করুন বা না করুন, কার্টেলগুলোই এখন মেক্সিকো চালাচ্ছে।’
কলম্বিয়া–ভেনেজুয়েলা সীমান্তবর্তী কুকুটা শহর থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক জন হোলম্যান বলেন, ট্রাম্পের এসব মন্তব্য লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। হোলম্যানের ভাষায়, “ট্রাম্প কার্যত বলছেন, লাতিন আমেরিকা আমাদের এলাকা। মাদুরোর সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পর এসব হুমকি এখন আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হবে।’
পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন উপস্থিতি বাড়ানো এবং উনিশ শতকের মনরো মতবাদ পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টি ট্রাম্প কখনোই গোপন করেননি। মনরো মতবাদ অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের অংশ। ট্রাম্প নিজে তার আধুনিক সংস্করণকে নাম দিয়েছেন ‘ডন-রো মতবাদ’।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প আদৌ কিউবা ও কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেবেন কি না, নাকি কেবল চাপ সৃষ্টি করে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতায় বাধ্য করতে চান—তা এখনই বলা কঠিন।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউএস স্টাডিজ সেন্টারের সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড স্মিথ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ট্রাম্প সাধারণত এমন ভঙ্গি নেন, যাতে অন্য দেশগুলো ভয় পেয়ে তার চাওয়া মেনে নেয়। ভেনেজুয়েলায় অভিযান বা ইরানে বোমা হামলার মতো প্রদর্শনমূলক শক্তি প্রয়োগ তারই উদাহরণ। মাদুরোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ট্রাম্পের হুমকি ধোঁকাবাজি ছিল না। এখন প্রশ্ন হলো, অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও তিনি একই পথে হাঁটবেন কি না।’