ভেনেজুয়েলা বললে বিশ্বের চোখে দুটি ছবি ভেসে ওঠে। একটি হলো মিস ওয়ার্ল্ড বা মিস ইউনিভার্সের মঞ্চে মুকুট হাতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো সুন্দরী, আর অন্যটি হলো চরম অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকতে থাকা এক দেশ। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতেই এই ছবির ওপর যোগ হলো মার্কিন কমান্ডো অভিযানের রক্তক্ষয়ী এক অধ্যায়।
প্রশ্ন উঠেছে, যে দেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সুন্দরীদের জন্ম দেয়, তারা কেন নিজেদের আকাশসীমা বা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারলো না?
ভেনেজুয়েলাকে বলা হয় ‘বিশ্বসুন্দরীদের কারখানা’। এখন পর্যন্ত দেশটি সাতটি মিস ইউনিভার্স এবং ছয়টি মিস ওয়ার্ল্ডসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক খেতাব জিতেছে। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দেশটির বিশাল বিউটি ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু একটি দেশ যখন কেবল গ্ল্যামার বা প্রাকৃতিক সম্পদের (তেল) ওপর নির্ভর করে এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়ে, তখন পরাশক্তিগুলোর জন্য তা ‘সফট টার্গেট’-এ পরিণত হয়।
সামরিক অসমতা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তির তুলনায় ভেনেজুয়েলা অনেক পিছিয়ে। ট্রাম্প প্রশাসনের আধুনিক ড্রোন, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং স্টিলথ প্রযুক্তির সামনে ভেনেজুয়েলার পুরনো রুশ ও চীনা সমরাস্ত্রগুলো অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জানত যে, সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে মাদুরোকে তুলে আনা সম্ভব, কারণ ভেনেজুয়েলার ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ অত্যন্ত দুর্বল।
অর্থনৈতিক ধস ও বাহিনীর মনোবল
বিগত কয়েক বছরের চরম মুদ্রাস্ফীতির কারণে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের জীবনযাত্রার মান তলানিতে ঠেকেছে। ক্ষুধার্ত সৈনিকদের পক্ষে একটি পরাশক্তির অত্যাধুনিক কমান্ডো বাহিনীর গতির সাথে পাল্লা দেওয়া কঠিন ছিল। ফলে সুন্দরীদের দেশের প্রতিরক্ষা দেওয়াল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ভেনেজুয়েলা কেবল একটি দেশ নয়, বরং একটি ‘ব্যবসায়িক সুযোগ’। এর কারণগুলো হলো:
তেল সম্পদ
ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ রয়েছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে এই তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া মার্কিন অর্থনীতির জন্য বড় জয়।
ভৌগোলিক অবস্থান
গ্রিনল্যান্ড বা মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কাছে। ঘরের কাছে এমন একটি ‘শত্রু’ (মাদুরো সরকার) রাখা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি ছিল।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অভাব
ট্রাম্প প্রশাসনের গোয়েন্দারা জানতেন, ভেনেজুয়েলার কাছে রাশিয়ার মতো পরমাণু অস্ত্র নেই বা চীনের মতো বিশাল নৌবাহিনী নেই। তাই সেখানে আঘাত করা ছিল সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ।
সৌন্দর্য বনাম সার্বভৌমত্ব
বিশ্বমঞ্চে ভেনেজুয়েলার সুন্দরীরা যখন দেশের সম্মান বাড়িয়েছেন, তখন দেশটির শাসকরা প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতি মজবুত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তেলের ওপর অতিনির্ভরশীলতা এবং সমরাস্ত্রের আধুনিকায়ন না করার চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে দেশটিকে। ট্রাম্পের এই হামলা প্রমাণ করে দিল, বর্তমান বিশ্বে গ্ল্যামার দিয়ে প্রশংসা পাওয়া গেলেও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন ইস্পাতকঠিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা।
ভেনেজুয়েলার ট্র্যাজেডি হলো—যে দেশ বিশ্বকে সৌন্দর্য শেখায়, সেই দেশটিই আজ বারুদের গন্ধে বিবর্ণ। ট্রাম্পের এই অভিযান হয়তো লাতিন আমেরিকার মানচিত্র বদলে দেবে, তবে ‘সুন্দরীদের দেশ’ হিসেবে পরিচিতি ছাপিয়ে ভেনেজুয়েলা এখন বিশ্বরাজনীতির দাবার গুটিতে পরিণত হয়েছে।