প্রযুক্তি জগতের শীর্ষ ধনকুবের থেকে শুরু করে রাজনীতির ক্ষমতাধর মুখ, রাজপরিবারের সদস্য, ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী ব্রোকার ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিক—এক সময়ের বিতর্কিত অর্থলগ্নিকার জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন বহু নাম উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রকাশিত বিপুল নথিপত্রে।
তবে যৌন নিপীড়ন ও মানবপাচারের ভয়াবহ অভিযোগে অভিযুক্ত এপস্টেইনের তদন্তসংক্রান্ত এসব নথিতে যাদের নাম রয়েছে, তারা এপস্টেইনের অপরাধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো—এপস্টেইনের বিরুদ্ধে নাবালিকাদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি তার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন, কেউ কেউ আবার নতুন করে যোগাযোগও গড়ে তোলেন।
২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে জেফ্রি এপস্টেইন আত্মহত্যা করেন বলে দাবি করা হয়। তবে এ নিয়েও রয়েছে রহস্য। অনেকে মনে করেন, প্রভাবশালীদের বাঁচাতে এপস্টেইনকে হত্যা করা হয়েছে। তার মৃত্যুর পরও থামেনি বিতর্ক। বরং নতুন করে প্রকাশিত নথিগুলো আবারও প্রশ্ন তুলেছে—ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে দীর্ঘদিন এপস্টেইনের মতো একজন অভিযুক্ত অপরাধীর সান্নিধ্যে ছিলেন।
এপস্টেইন ফাইলে উঠে আসা রথী-মহারথী
প্রিন্স অ্যান্ড্রু (অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর)
ব্রিটেনের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই বিতর্কিত। প্রয়াত ভিক্টোরিয়া রবার্টস জিউফ্রে অভিযোগ করেছিলেন, ১৭ বছর বয়সে তাকে এপস্টেইনের মাধ্যমে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয়েছিল।
অ্যান্ড্রু এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করলেও, ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস গত বছর তার রাজকীয় উপাধি ও ‘ডিউক অব ইয়র্ক’ পদবি কেড়ে নেন।
সর্বশেষ প্রকাশিত নথিতে অ্যান্ড্রুর নাম কয়েকশবারের বেশি এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজের আমন্ত্রণ, এক রুশ তরুণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব এবং কিছু বিতর্কিত ছবি।
সারাহ ফার্গুসন
২০১১ সালে এপস্টেইনের কাছ থেকে ঋণ পরিশোধের অর্থ নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চান সাবেক ডাচেস অব ইয়র্ক সারাহ ফার্গুসন। তিনি বলেছিলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখবেন না।
তবে মাত্র দুই মাস পরই অপরা উইনফ্রের শোতে যাওয়ার আগে এপস্টেইনের কাছে ইমেইলে পরামর্শ চান—কীভাবে তার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিত।
ইলন মাস্ক
টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের নামও উঠে এসেছে নথিতে। ২০১২ ও ২০১৩ সালে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার আলোচনা সংক্রান্ত ইমেইল পাওয়া গেছে। তবে দ্বীপে আদৌ তিনি গিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। মাস্ক দাবি করেছেন, এপস্টেইনের প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
রিচার্ড ব্র্যানসন
ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ব্র্যানসন একাধিকবার এপস্টেইনের সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করেছিলেন। এমনকি তাকে নিজের ব্যক্তিগত দ্বীপে আমন্ত্রণও জানান। তবে পরে গুরুতর অভিযোগ জানার পর এপস্টেইনের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ ছিন্ন করেন বলে দাবি তার প্রতিষ্ঠানের।
ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টেইনের বন্ধুত্বের কথা আগে থেকেই জানা। নতুন নথিতে ট্রাম্পের নাম হাজারবারের বেশি এসেছে।
তবে এসব তথ্যের বেশিরভাগই গুজব বলে দাবি করেন ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠরা। এছাড়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।
বিল ক্লিনটন
সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন এবং হোয়াইট হাউসেও তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
তবে ক্লিনটনের প্রতিনিধিরা দাবি করেন, ২০০৬ সালের পর তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন। কোনো ভুক্তভোগী ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিযোগও তোলেননি।
স্টিভেন টিশ
নিউইয়র্ক জায়ান্টসের সহ-মালিক স্টিভেন টিশের নাম ৪০০ বারের বেশি এসেছে। ইমেইলে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের নিয়ে অশালীন কথোপকথনের প্রমাণ মিলেছে। তিনি অবশ্য এপস্টেইনের দ্বীপে যাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
কেইসি ওয়াসারম্যান
২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক কমিটির প্রধান ওয়াসারম্যানের সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের ফ্লার্ট করার ইমেইল পাওয়া গেছে। তিনি দাবি করেছেন, এগুলো ম্যাক্সওয়েলের অপরাধ প্রকাশ্যে আসার বহু আগের ঘটনা।
এহুদ বারাক
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক নিয়মিত এপস্টেইনের বাড়িতে যেতেন এবং তার বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন। তবে তিনি কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখেননি বলে দাবি করেন।
ল্যারি সামার্স
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ল্যারি সামার্স এপস্টেইনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রাখতেন। তিনি পরে একে ‘বিচার-বিবেচনার বড় ভুল’ বলে স্বীকার করেন।
স্টিভ ব্যানন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন এপস্টেইনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। এমনকি এপস্টেইনের ভাবমূর্তি ‘উদ্ধার’ নিয়ে ডকুমেন্টারি করার আলোচনাও চলছিল।
মিরোস্লাভ লাইচাক
স্লোভাকিয়া প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিরোস্লাভ লাইচাকের নাম নথিতে আসার পর তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি দাবি করেছেন, এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কেবল কূটনৈতিক দায়িত্বের অংশ।
এপস্টেইন ফাইলসে উঠে আসা এসব রথি-মহারথির নাম যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো কতটা জটিল, আর প্রভাবশালীদের নৈতিকতা কতটা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত এসব নামের কাউকে এপস্টেইনের অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়নি, তবু প্রশ্ন থেকে যায়—জানার পরও কেন এতজন প্রভাবশালী এপস্টেইনের সান্নিধ্যে ছিলেন?