ভারতের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি আলোকচিত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম সারির। রোববার (২৬ এপ্রিল) ভোরে দিল্লিতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তার পরিবারের বরাত দিয়ে ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম এ তথ্য।
তার ছেলে ও আলোকচিত্রী নিতিন রাই জানিয়েছেন, দুই বছর ধরে তিনি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। প্রথমে প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্ত হলেও তা নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে পেটে ছড়িয়ে পড়লেও সেটিও চিকিৎসায় সেরে ওঠেন। তবে সম্প্রতি ক্যানসার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ায় অবস্থার অবনতি ঘটে। সেই সঙ্গে বয়সজনিত জটিলতাও বাড়ে। রোববার সন্ধ্যায় লোধি রোড শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
১৯৪২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের ঝাং এলাকায় (বর্তমানে পাকিস্তানে) জন্মগ্রহণ করেন রঘু রাই। মাত্র ২৩ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ক্যামেরার সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিতি পান একজন খ্যাতিমান ফটোসাংবাদিক হিসেবে। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও আলোকচিত্রকেই নিজের প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নেন। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত ছিল তার সমৃদ্ধ কর্মজীবন।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি পেশাদার জীবন শুরু করে ১৯৬৫ সালে তিনি দ্যা স্টেটসম্যান পত্রিকায় আলোকচিত্রী হিসেবে যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনা কভার করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন সানডের পিকচার এডিটর হিসেবে যোগ দেন। পরের বছর কিংবদন্তি ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ তাকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ম্যাগনাম ফটোসে যোগদানের জন্য মনোনীত করেন। ১৯৮০ সালে তিনি ইন্ডিয়া টুডেতে যোগ দিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। ১৯৮৪ সালের ভুপাল গ্যাস দুর্ঘটনার ওপর তার কাজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়। এ বিষয়ে তিনি ‘এক্সপোজার : এ করপোরেট ক্রাইম’ বইটিও লেখেন।
ভারতের নানা প্রান্তে ঘুরে তিনি দেশের বৈচিত্র্য, সমাজবাস্তবতা ও মানুষের জীবনচিত্র ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা, শিবসেনা প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরে ও চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ছবি ধারণের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তার ক্যামেরায় উঠে এসেছে মাদার তেরেসার মতো মানবতাবাদী ব্যক্তিত্বও। আলোকচিত্রে অবদানের জন্য দেশে-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন রঘু রাই।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ভারতের মানুষ, সংস্কৃতি ও শহর নিয়ে ১৮টিরও বেশি বই প্রকাশ করেছেন। তার তোলা ছবি টাইম, লাইফ, দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউজ উইক, দ্যা নিউ ইয়র্কারসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আলোকচিত্র ধারণের জন্য তিনি প্রশংসিত হন। সেই অসামান্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ পদকেও ভূষিত করে।। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবির, সীমান্ত এলাকা ও যুদ্ধের মানবিক বাস্তবতা ক্যামেরায় ধারণ করেন এই কিংবদন্তি আলোকচিত্রী। তার তোলা শরণার্থীদের দুর্দশা, অনাহার, ক্লান্তি ও সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলা মানুষের ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে, যা পরবর্তীতে হয়ে উঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।