কালের সাক্ষী হয়ে প্রায় আড়াইশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঐতিহাসিক জামালপুর জমিদার বাড়ির জামে মসজিদ। ১৭৮০ সালে যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়, আর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হতে সময় লাগে দীর্ঘ ২১ বছর। চার প্রজন্মের প্রচেষ্টায় নির্মিত এ মসজিদ আজও তার নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে টিকে থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এ মসজিদ জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, তৎকালীন প্রভাবশালী জমিদার জামাল উদ্দিন চৌধুরী মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তাঁর নামানুসারেই এলাকার নামকরণ হয় ‘জামালপুর’। পরবর্তীতে এ অঞ্চল জামালপুর ইউনিয়ন হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে।
জমিদারি প্রতিষ্ঠা ও নির্মাণের ইতিহাস
জানা যায়, আবদুল হালিম চৌধুরী ১৮শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তিনি তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট মহকুমার রাজগঞ্জ থানার তাজপুর গ্রাম থেকে এসে এখানে ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয়ের মাধ্যমে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ব্রিটিশ শাসনামলে ‘চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত হন।
১৭৭০-এর দশকে তিনি রাজপ্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। রাজবাড়ির নির্মাণকাজ চলাকালীন ১৭৮০ সালে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরিরা নির্মাণকাজ চালিয়ে যান। অবশেষে ১৮০১ সালের দিকে মসজিদের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। চার পুরুষের প্রচেষ্টায় দীর্ঘ ২১ বছরে নির্মিত এ মসজিদ ঐতিহাসিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
স্থাপত্যশৈলীর অনন্যতা
মসজিদটির প্রধান আকর্ষণ এর ২৪টি মিনার। ছাদের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এসব মিনারের প্রতিটির উচ্চতা প্রায় ৩৫ ফুট। এত সংখ্যক মিনার সম্বলিত মসজিদ দেশে খুব কমই দেখা যায়। এছাড়া রয়েছে বড় আকৃতির তিনটি গম্বুজ, যেগুলোর শীর্ষদেশে পাথরের কারুকাজ রয়েছে।
মসজিদের প্রবেশমুখে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি তোরণ। ভেতরে ও বাইরে দেয়ালজুড়ে লতাপাতা ও ফুলের নকশা খচিত কারুকাজ আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। মসজিদের মূল দৈর্ঘ্য ৪১ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ১১ ফুট ৯ ইঞ্চি। রয়েছে দুটি বারান্দা— একটি ছাদযুক্ত এবং অন্যটি খোলা। মূল কক্ষে তিনটি দরজা, দুটি জানালা ও দুইটি কুলুঙ্গি রয়েছে। একসঙ্গে প্রায় ৩০০ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন।
ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত, তবুও টিকে আছে
১৯৬৫ সালের দিকে প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে ১১টি মিনার ভেঙে যায়। পরবর্তীতে জমিদার পরিবারের সদস্যরা ৭টি মিনার সংস্কার করলেও ৪টি এখনো ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেয়ালের কিছু অংশে ফাটল ও ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
২০০৬ সালে মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হলেও এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো বড় সংস্কারকাজ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রায় দুই দশক আগে সংরক্ষণের দায়িত্ব নেওয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবেই ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এ স্থাপনাটি।
সংরক্ষণের দাবি ও সম্ভাবনা
দর্শনার্থীরা মনে করেন, যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করা হলে এটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ এ মসজিদ দেখতে আসেন। ১৯৯৫ সাল থেকে এখানে ইমামতি করছেন হাফেজ মো. রুহুল আমিন। তিনি জানান, ‘ঐতিহাসিক এ মসজিদ দেখতে প্রতিদিনই অনেক মানুষ আসেন। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে আমরা উদ্বিগ্ন।’
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মসজিদ সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে আড়াইশ বছরের ইতিহাস বহনকারী এ স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
ঐতিহাসিক এ মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি ঠাকুরগাঁওয়ের গৌরবময় অতীতের এক জীবন্ত সাক্ষী। যথাযথ সংরক্ষণই পারে এর স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য দীর্ঘদিন ধরে অটুট রাখতে।