কক্সবাজারে পর্যটকের জোয়ার
জাতীয় নির্বাচন ও পবিত্র রমজান মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতর ও সাপ্তাহিক ছুটিকে ঘিরে টানা ছুটিতে সমুদ্র সৈকতজুড়ে নেমেছে পর্যটকদের ঢল। এতে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে পুরো পর্যটন খাত।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের ছুটির শুরু থেকে ২৫ মার্চ (বুধবার) পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণ করেছেন। এ সময়ে পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় ৫৮০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২৮ মার্চের (শনিবার) মধ্যে পর্যটকের সংখ্যা ৬ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং বাণিজ্যের পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকাল থেকেই সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট—লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলীসহ অন্যান্য পর্যটন স্পটে নানা বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বসন্তের মনোরম আবহাওয়ায় সূর্যাস্ত উপভোগ ও সাগরের নোনা পানিতে গোসল করতে ভিড় করছেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা।
সৈকতে দায়িত্ব পালনরত সী-সেইফ লাইফ গার্ড কর্মী জয়নাল আবেদীন ভুট্টো জানান, সমুদ্রের প্রতিটি পয়েন্টেই পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফগার্ডরা সতর্ক অবস্থানে কাজ করছেন।
অন্যদিকে, হোটেল-মোটেল জোন ও আশপাশের সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। বড় বাসগুলো টার্মিনালে অবস্থান করলেও মাঝারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি শহরে প্রবেশ করায় ভোগান্তি বেড়েছে। বাইপাস সড়ক, কলাতলী ডলফিন মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে যানজট ও মানুষের চাপ স্পষ্ট।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মাঠে রয়েছে র্যাব সদস্যরাও। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতও সক্রিয় রয়েছে।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের ওসি মোহাম্মদ কেফায়েত উল্লাহ জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের অধিকাংশ কক্ষ ঈদের সপ্তাহখানেক আগেই বুকিং হয়ে যায়। পর্যটন স্পটগুলো সিসিটিভির আওতায় এনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
হোটেল ব্যবসায়ী আবদুল কাদের মিশু বলেন, ‘পর্যটকরাই আমাদের মূল চালিকাশক্তি। উন্নত সেবা নিশ্চিত করে কক্সবাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে আমরা কাজ করছি।’
পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের ছুটি ও টানা ছুটির কারণে কক্সবাজারের পর্যটন এলাকা পূর্ণভাবে ব্যস্ত। হোটেল ও মোটেলে আগমনকারী পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের আশাব্যঞ্জক মনে হচ্ছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল শুক্কুর জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচন ও রমজান শেষে ঈদ ছুটিকে ঘিরে কক্সবাজারের পর্যটন খাত ও দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি এসেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫৮০ কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসার লেনদেন হয়েছে, যা আবাসন, পরিবহন, খাদ্য, ট্যুর সেবা, বিনোদন এবং খুচরা ব্যবসাসহ সব খাতকে সক্রিয় করেছে।
তিনি আরও বলেন, উন্নত সেবা ব্যবস্থাপনা, সহজ পরিবহন ও মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলে ভবিষ্যতে এ আয় আরও বাড়বে। পাশাপাশি বিমান ভাড়া কমানো ও অতিরিক্ত মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পর্যটন খাত আরও টেকসই হবে, যা অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও দেশের পর্যটন ভাবমূর্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান জানান, বাড়তি পর্যটকের চাপ সামাল দিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। সৈকতে নারী পুলিশ সদস্যরাও পর্যটক বেশে দায়িত্ব পালন করছেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টে সবচেয়ে বেশি ভিড় হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।