দারিদ্র্য, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর একের পর এক পারিবারিক শোক—সব বাধা পেরিয়ে এক হাতেই স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছে জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের অদম্য মেধাবী মো. নাহিদ। ডান হাত না থাকলেও থেমে নেই তার শিক্ষা সংগ্রাম। বাঁ হাত দিয়েই এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে সে। এমনই অদম্য ইচ্ছার পরীক্ষার্থীর দেখা মিলেছে আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। কেন্দ্র থেকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হলেও তা নেয়নি সে। প্রমাণ করতে চায় ইচ্ছার কাছে প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়। তবে তার স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই কেন্দ্রের ৪ নম্বর কক্ষে বাঁ হাতে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে নাহিদ। ডান হাত কনুইয়ের নিচ থেকে নেই। অন্যান্য সুস্থ ও স্বাভাবিক পরীক্ষার্থীর মতোই বাঁ হাতে লিখে যাচ্ছে সে।
পরীক্ষা শেষে তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জন্ম থেকেই তার এই প্রতিবন্ধকতা, নেই তার ডান হাতের কনুইয়ের নিচের অংশ। পরিবারের দারিদ্র্য হার মানাতে পারেনি তাকে। শিক্ষা জীবনে প্রতিটি শ্রেণিতে মেধার পরিচয় দিয়েছে। মানুষ হওয়ার অদম্য লক্ষ্য নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে পড়াশোনা।
আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব মো. আব্দুল মোমিন বলেন, ‘নাহিদ বাঁ হাত দিয়ে খুব সুন্দরভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে। তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তার মনোবল দেখে আমরা মুগ্ধ।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সে পৌর এলাকার শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের নুরল ইসলাম ও নাসিমা বিবি দম্পতির ছেলে। নাহিদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে সাত বছর আগে, যখন তার বাবা নুরুল ইসলাম ব্রেন স্ট্রোক করে মারা যান। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তিন বছর আগে মারা যান তার বড় ভাই মোজাম্মেল হোসেন। একের পর এক প্রিয়জন হারিয়ে পরিবারটি যেন দিশেহারা হয়ে পড়ে। বর্তমানে নাহিদ ও তার জমজ ভাই নাসিমকে নিয়ে সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন তাদের মা নাসিমা বিবি। জমিজমা বলতে কিছুই নেই। সংসার চালাতে তিনি আলুর চিপস তৈরি করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অভাব-অনটনের মাঝেই বড় হয়েছে দুই ভাই। তাদের মধ্যে নাহিদ শারীরিক প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকেই ডান হাত নেই। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বাম হাত দিয়ে লিখেই সে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে তার জমজ ভাই নাসিম স্বাভাবিক, সেও একই সঙ্গে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
নাহিদ বিশেষচাহিদা সম্পন্ন হলেও সাংসারিক এবং প্রয়োজনীয় সব কাজ করতে পারে। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন প্রতি শ্রেণিতেই মেধার পরিচয় দিয়েছে। সে প্রমাণ করতে চায় ইচ্ছা আর প্রচেষ্টার কাছে প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে সব সুবিধা পাচ্ছে নাহিদ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সে ভালো করেছে আর এবারও ভালো ফলাফল করবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
নাহিদ বলেন, জন্ম থেকেই আমার ডান হাত নেই। আমি বাঁ হাত দিয়েই সব কাজ করতে পারি। প্রতিবন্ধকতার মধ্যদিয়ে আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। বাঁ হাতে লিখে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি এখন পর্যন্ত পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। আমি প্রমাণ করতে চাই প্রতিবন্ধিতা কোনো বাধা নয়।
কথা হয় তার মা নাসিমা বিবির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছোট থেকেই নাহিদ পড়ালেখায় ভালো। তার ডান হাত না থাকলেও সংসারের সব কাজ করে পরিবারে সহযোগিতা করে আসছে। সে কখনো নিজেকে প্রতিবন্ধী বা শারীরিকভাবে অক্ষম মনে করে না। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে মেজো। পরিবারে অভাব থাকায় তাকে নিয়ে চিন্তিত। তার ইচ্ছা পূরণে সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
আক্কেলপুর সরকারি ফজর উদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন বলেন, ‘নাহিদ মেধাবী ও পরিশ্রমী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সে যেভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। সে হার মানতে নারাজ। ভবিষ্যতে সে অনেক ভালো পর্যায়ে যাবে বলে মনে করি।’