শিল্পনগরী গাজীপুরে দিন দিন বাড়ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। একদিকে নির্মাণে মানা হচ্ছে না অনুমোদিত নকশা, অন্যদিকে দুর্বল কাঠামোর ওপর গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে সরকারি বিভিন্ন দফতরের কার্যক্রম। ফলে পুরো জেলার পরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।
গাজীপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র রাজদিঘীর পাশেই নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত একটি ১০ তলা ভবন এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একাধিকবার ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও, সেখানে চলছে জেলা পরিসংখ্যান অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম। এতে সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা।
শুধু এই ভবনই নয়, সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ— গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (গাউক) কার্যালয়ও একটি অপরিকল্পিত ভবনে পরিচালিত হচ্ছে।
এছাড়াও জেলার অধিকাংশ থানাই ভাড়াকৃত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সরকারি সংস্থাগুলোই যখন নিয়মের তোয়াক্কা করছে না, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়ম মানার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শিল্পাঞ্চল হওয়ায় গাজীপুরে দ্রুত বাড়ছে জনসংখ্যা ও ঘনবসতি। সেই সঙ্গে বাড়ছে বহুতল ভবনের সংখ্যা। তবে এসব ভবনের বড় একটি অংশই নির্মিত হচ্ছে অনুমোদন ছাড়াই। একসময় পৌরসভা, পরে সিটি করপোরেশন এবং বর্তমানে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ— প্রতিটি সংস্থাই পরিকল্পিত নগরায়ণে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবিষয়ে গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, সরকারি দফতরগুলোর নিয়ম না মানা দুঃখজনক। তিনি জানান, ভবিষ্যতে নতুন নির্মাণে কঠোর নজরদারি থাকবে এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
এদিকে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মাননান জানান, জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন তদারকি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে শিগগিরই অনুমোদনহীন ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে। প্রয়োজনে এসব ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথাও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনাহীন ভবন নির্মাণের কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। অনেক এলাকায় সরু রাস্তার কারণে ফায়ার সার্ভিসের যানবাহন প্রবেশ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাজীপুর জেলার সচেতন নাগরিক কমিটির সহ-সভাপতি শেকানুল ইসলাম শাহী বলেন, পরিকল্পিত নগরের স্বপ্ন বহুদিনের। কিন্তু দফায় দফায় কর্তৃপক্ষ বদলালেও সমস্যার সমাধান হয়নি। সমন্বিত উদ্যোগ নিলে এখনও পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এমন বাস্তবতায় সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কঠোর নজরদারির মাধ্যমেই গাজীপুরকে পরিকল্পিত নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব— এমনটাই মনে করছেন সচেতনমহল।