শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বহুল প্রত্যাশিত ৫০ শয্যার আধুনিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চালুর আগেই ভয়াবহ লুটপাটের কবলে পড়ে কার্যত পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। প্রায় ৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারতলা বিশিষ্ট এই হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে অচল ও অরক্ষিত থাকায় একের পর এক চুরির ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধকোটি টাকার সরকারি সম্পদ খোয়া গেছে। এতে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে স্থানীয়দের মাঝে।
সর্বশেষ গত সপ্তাহে গভীর রাতে সংঘবদ্ধ একটি চক্র হাসপাতালের একাধিক কক্ষের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা জেনারেটরের মূল্যবান কয়েল, একাধিক এসি ইউনিট, বিদ্যুৎ সংযোগের তার, সুইচগিয়ারসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এর আগে গত কয়েক মাসে আরও কয়েক দফা চুরির ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবারই থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা বা স্থায়ী নিরাপত্তা জোরদার করা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে, চোরচক্রটি আরও সংগঠিত হয়ে বারবার একই স্থানে হামলা চালাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাসপাতাল ভবনটি বর্তমানে সম্পূর্ণ অরক্ষিত। কোনো স্থায়ী নিরাপত্তাকর্মী নেই, নেই সিসিটিভি নজরদারিও। রাতে ভবনটি অন্ধকারে ডুবে থাকে, যা চোরদের জন্য সহজ টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষের চিকিৎসার জন্য এত বড় প্রকল্প নেওয়া হলো, অথচ চালু না করেই লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এটা চরম অবহেলার ফল।’
অন্য বাসিন্দা আলাউদ্দিন বেপারী বলেন, ‘সরকারি সম্পদ এভাবে নষ্ট হতে থাকলে সাধারণ মানুষ কীভাবে উপকৃত হবে? দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো ভবনটাই একসময় খালি হয়ে যাবে।’
জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে নড়িয়া পৌরসভার বৈশাখীপাড়া এলাকায় এই হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার এবং পাঁচ শয্যার আইসিইউ ইউনিটসহ সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু, প্রশাসনিক জটিলতা, জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও আদালতের মামলার কারণে প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার পরও চালু করা যায়নি।
নির্মাণ শেষ হলেও ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর না হওয়ায় দায়িত্ব নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। জেলা সিভিল সার্জন অফিস বলছে, ভবনটি এখনো তাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, তাই তারা সরাসরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন না।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দাবি করছে, নির্মাণ শেষ হওয়ার পর তাদের দায়িত্ব সীমিত, নিরাপত্তার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগের।
জাতীয় নির্বাচনের সময় অস্থায়ীভাবে এখানে সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। তখন কিছুটা নিরাপত্তা থাকলেও তারা চলে যাওয়ার পর ভবনটি আবারও অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাহার মিয়া বলেন, ‘চুরির ঘটনাগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু তদন্তে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলা করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত হাসপাতালটি চালুর উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, দ্রুত হাসপাতালটি চালু করা গেলে একদিকে যেমন লুটপাট বন্ধ হবে, অন্যদিকে নড়িয়া উপজেলার হাজারো মানুষ কাঙ্ক্ষিত আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে যা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।