স্ত্রীর পীড়াপীড়ি ও সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য কোনো অপরাধে না জড়ানোর সিদ্ধান্তও নেন সুন্দরবনে সক্রিয় ‘আলামিন বাহিনীর প্রধান আলামিন। দেড় বছর বয়সী যমজ সন্তানকে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞাও করেন, অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করবেন। বিষয়টি দলের সদস্যদের জানাতে আলামিন গত ১৬ এপ্রিল যান সুন্দরবনে। এরপর থেকে তার খোঁজ মিলছে না। যে নম্বর থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, সেটিও বন্ধ।
সুন্দরবনের গভীরে এক সময়ের আত্মসমর্পণকারী বনদস্যু আলামিনের নিখোঁজ হওয়া এখন শুধু একটি পারিবারিক উদ্বেগ নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে বহুস্তরীয় রহস্যে। সেখানে জড়িয়ে আছে পুরনো অপরাধচক্র, স্থানীয় আধিপত্য, প্রতিশোধ এবং অজস্র উত্তরহীন প্রশ্ন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৪ এপ্রিল আলামিন শেষবারের মতো স্বাভাবিকভাবে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। স্ত্রী রাবেয়া খাতুনের দাবি, সেই সময় তিনি স্পষ্টভাবে জানান— আর দস্যুতার পথে ফিরবেন না। তিনি দুই শিশুসন্তানকে কাছে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করেন, অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন। এই বক্তব্যই ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই তাকে জীবিতভাবে ফিরিয়ে এনেছে না মৃত অবস্থায়— এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে।
পরদিন গত ১৬ এপ্রিল আলামিন সুন্দরবনের উদ্দেশে রওনা দেন। উদ্দেশ্য ছিল—তার বাহিনীর সদস্যদের আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত জানানো। কিন্তু, এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বা তার অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। পরদিনই গত ১৭ এপ্রিল ছড়িয়ে পড়ে— নদীতে আলামিনের লাশ ভেসে উঠেছে। কিছু এলাকায় এই খবর এতোটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে যে মিষ্টি বিতরণের ঘটনাও শোনা যায়। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। খুলনা জেলা পুলিশ সুপার মো. তাজুল ইসলাম জানান, ওই সময়ে কোনো লাশ উদ্ধার হয়নি, এমনকি কোনো মৃত্যুর অফিসিয়াল তথ্যও নেই।
জানা যায়, ২০১৮ সালে তিনি বনদস্যুতা ছেড়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এরপর চিংড়ির রেণু ব্যবসায় যুক্ত হন। কিন্তু, ২০২৪ সালের পর সুন্দরবনের অপরাধচক্র আবার সক্রিয় হলে তিনি ফের দস্যুতা শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজেই একটি ছোট দল গঠন করেন, যা ‘আলামিন বাহিনী’ নামে পরিচিতি পায়। এই পুনঃপ্রবেশ তাকে আবারও সংঘাতপূর্ণ জগতের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। স্ত্রী রাবেয়া খাতুন জানান, স্থানীয় এক অপরাধীর কাছে অপমানিত হওয়ার পর তিনি আবার দস্যুতায় জড়িয়ে পড়েন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুতপ্ত হন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
পরিবারের দাবি, এই সিদ্ধান্তই ছিল তার শেষ সিদ্ধান্ত। স্ত্রীর প্রশ্ন— ‘যদি তিনি ফিরতেই চেয়েছিলেন, তাহলে তিনি কোথায় গেলেন?’ আলামিনের ভাই ইলিয়াস আলী এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তার দাবি, হান্নান সরদার নামে এক হরিণ শিকারি চক্রের সঙ্গে আলামিনের দীর্ঘদিনের শত্রুতা ছিল। আলামিনকে একবার নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে স্লুইসগেট এলাকা থেকে খালে ফেলে দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর আলামিন প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন। এই বিরোধই পরবর্তীতে সহিংসতার দিকে গড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে|
সূত্র অনুযায়ী, আলামিন এক পর্যায়ে ওই শিকারি চক্রের এক সদস্যকে ধরে শাস্তি দেন এবং পায়ে গুলি করেন। এরপরই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এই পাল্টা প্রতিশোধের পর তার ওপর চাপ বাড়তে থাকে এবং ঠিক এর পরপরই আসে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা| সূত্র বলছে আলামিনের বিরুদ্ধে আগেও মামলা ছিল। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগও ওঠে। অন্যদিকে, আলামিনের পক্ষ থেকেও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। ঘটনার কয়েকদিন আগে নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করার বিষয়টিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। কয়রা থানা ও বন বিভাগ জানিয়েছে, আলামিনের মৃত্যুর বিষয়ে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি| তল্লাশি চালানো হলেও লাশ বা কোনো নিদর্শন উদ্ধার হয়নি। ফলে প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি এখনো ‘নিখোঁজ’ হিসেবেই রয়ে গেছে।