কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও ঝোড়ো হাওয়ায় বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ক্ষেতে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বিপর্যয়। মাঠে নুইয়ে পড়েছে পাকা ধান। আর সেই ধানের শীষে গজিয়ে উঠতে শুরু করেছে চারা। পানির নিচে থাকা ধান কষ্ট করে শ্রমিক দিয়ে কাটলেও তা বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এতে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন জেলার হাজারো কৃষক।
মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার আন্ধার মানিক গ্রাম, সদর উপজেলার উৎকুল এলাকা ও ফকিরহাটের কয়েকটি মাঠ ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ জমিতে পাকা ধান নুইয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ধানের শীষে গজিয়েছে চারা।
কচুয়ার আন্ধার মানিক গ্রামের কৃষক শেখ রুস্তম আলী এ বছর ২ একর ৫০ শতক জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় তার প্রায় দুই একর জমির ধান মাটিতে মিশে গেছে।
রুস্তম আলী বলেন, ‘আড়াই একর জমিতে চাষ করতে এক লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে ধান কাটতে ২৫-৩০ হাজার টাকা লাগে। এখন পানির নিচ থেকে ধান কাটতে শ্রমিকরা ৮০ হাজার টাকা চাচ্ছে। গরুর খাবারের জন্য কুটা দরকার বলেই কাটছি, না হলে এই ধান কাটতাম না। সব শেষ হয়ে গেল।’
একই গ্রামের কৃষক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘নিজের জমি নাই, ২০ হাজার টাকা দিয়ে এক বিঘা জমি লিজ নিয়েছিলাম। ধান খুব ভালো হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে সব নুয়ে পড়ে চারা গজিয়েছে। দিনে এক হাজার টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। ছেলেকে মাদরাসা থেকে এনে সঙ্গে নিয়ে ধান কাটছি।’
বাগেরহাট সদর উপজেলার উৎকুল গ্রামে দেড় বিঘার মাছের ঘেরে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন কৃষক আব্দুল হামিদ। শ্রমিকের অভাবে ধান তুলতে না পারায় তা পচে গিয়ে ঘেরের মাছেরও ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ধান তো গেছেই, এখন ঘেরের চিংড়ি আর সাদা মাছও মারা যাচ্ছে। কিছু মাছ কম দামে বিক্রি করেছি। এবারের বৃষ্টি আমাদের পথে বসিয়ে দিল।’
এদিকে যেসব কৃষক ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন, তারাও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। গত বছর প্রতি মণ ধান ৯০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার ভেজা ও নিম্নমানের কারণে ৬০০ থেকে ৮৫০ টাকার বেশি দাম মিলছে না।
ফজলুল হক নামে এক চাষি বলেন, ‘ফলন ভালো হয়েছিল। দুই বিঘায় ৮০ মণ ধান পেয়েছি। কিন্তু ধান ভেজা থাকায় ৭৫০ টাকা মণে বিক্রি করতে হয়েছে। এতে খরচের টাকাও উঠবে না।’
কৃষকদের অভিযোগ, আকস্মিক দুর্যোগে ধান নষ্ট হলেও অনেক এলাকায় সরকারি সহায়তা পাননি কৃষকরা। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে বাগেরহাটে ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে অন্তত ১ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির পর মাঠ পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা হয়েছে। অনেক কৃষকের ধান নষ্ট হয়েছে। শ্রমিক সংকট ও অতিরিক্ত মজুরির কারণে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরকারি প্রণোদনা এলে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’