মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চলে চিকিৎসা বলতে এখনো ভরসা ঝাড়ফুঁক, কবিরাজ আর ভাগ্য। প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস হলেও সেখানে নেই কোনো হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্থায়ী চিকিৎসক কিংবা নৌ-অ্যাম্বুলেন্স। যার কারণে সামান্য জ্বর থেকে শুরু করে প্রসবজনিত জটিলতা—প্রতিটি অসুস্থতাই হয়ে উঠছে জীবন-মৃত্যুর লড়াই। জরুরি চিকিৎসার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীপথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক রোগী আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছেন, আর চিকিৎসার অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিন কাটছে পুরো চরবাসীর।
সম্প্রতি সরেজমিনে চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, সাধারণ জ্বর, ডায়রিয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো রোগের চিকিৎসাও সেখানে সহজলভ্য নয়। জরুরি রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিশাল পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা পাঁচ্চর হাসপাতালে যেতে হয়। নদীপথে যাতায়াতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র স্রোত কিংবা রাতের বেলায় নৌযান না থাকলে রোগী হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে চরজানাজাত ইউনিয়নের ভূমিহীন এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ বিলীন হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালে নতুন চর জেগে ওঠে এবং ২০২২ সাল থেকে সেখানে পুনর্বাসিত হয়ে বসবাস শুরু করেন স্থানীয়রা। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস হলেও এখনো সেখানে কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো স্বাস্থ্যসেবা না থাকায় সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও তারা নানা সংকটে পড়েন। প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে অনেকেই ঝাড়ফুঁক, কবিরাজ বা অনভিজ্ঞ চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। এতে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয় গর্ভবতী, নবজাতক, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী চিকিৎসাসেবার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী বাড়িতেই ঝুঁকি নিয়ে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, জ্বর ও অপুষ্টির প্রকোপও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন তারা।
চরের বাসিন্দা জুলেখা বেগম বলেন, ‘গত মাসে গভীর রাতে আমার প্রসববেদনা ওঠে। কোনো নৌকা না পাওয়ায় ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে নদী পার হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। মাঝরাতে কিছু হলে হয়তো বাঁচতাম না।’
বৃদ্ধ জব্বার মোল্লা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছি। অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ নেই। নদী পার হতে দেরি হলে জীবন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়।’
তাসলিমা সালমা বিবি বলেন, ‘সন্তানের জ্বর বা ডায়রিয়া হলে খুব ভয় লাগে। এখানে ডাক্তার নেই, ওষুধও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে স্থানীয় কবিরাজের কাছে যেতে হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ আমরা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও চিকিৎসক নিয়োগ এখন সময়ের দাবি।’
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারী বলেন, গুরুতর রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষা, যোগাযোগ ও বিদ্যুতের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই চরাঞ্চল। বিভিন্ন সময়ে হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন চরবাসী।
এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, ‘উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জনবল সংকটের কারণে দুর্গম চরাঞ্চলে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার সপ্তাহে দুই দিন সেবা দিচ্ছেন। এছাড়া নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পাশাপাশি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ৩০ শতাংশ জমি পাওয়া গেলে ইউএনও কমিটির মাধ্যমে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।