সুনীল অর্থনীতির (ব্লু ইকোনমি) বিকাশে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) জন্য নির্মিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের একটি অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ। প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ জাহাজের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র, সমুদ্রতলের গ্যাস হাইড্রেট, মূল্যবান খনিজ সম্পদ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নিজস্ব সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
সরকারি এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ডে জাহাজটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর নকশা করেছে যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা সামুদ্রিক নকশা প্রতিষ্ঠান কিল মেরিন।
অন্যদিকে গবেষণায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, চীন, তুরস্ক ও সিঙ্গাপুর থেকে। বোরি ও খুলনা শিপইয়ার্ডের মধ্যে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুনে জাহাজটি ইনস্টিটিউটের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রথমবার গভীর সমুদ্রে নিজস্ব গবেষণা
বাংলাদেশের প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড) দীর্ঘদিন ধরেই বিপুল সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনাময় ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রয়োজনীয় গবেষণা অবকাঠামোর অভাবে সেই সম্ভাবনার পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব হয়নি।
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট এতদিন সমুদ্র গবেষণার জন্য মাছ ধরার ট্রলার কিংবা বিদেশি গবেষণা জাহাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে গবেষণা সীমাবদ্ধ ছিল উপকূলীয় অগভীর এলাকায়। নতুন গবেষণা জাহাজ যুক্ত হলে প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্র ও সমুদ্রতলের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন, জ্বালানি সম্পদ এবং পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
জাহাজেই থাকবে পূর্ণাঙ্গ গবেষণাগার
নতুন গবেষণা জাহাজটিকে একটি ভাসমান গবেষণাগার হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। এতে থাকবে ওয়েট ল্যাব, ড্রাই ল্যাব এবং ডেটা অ্যানালাইসিস ল্যাবসহ তিনটি আধুনিক গবেষণাগার। সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা পানি, পলি, সামুদ্রিক জীব ও অন্যান্য নমুনা তাৎক্ষণিকভাবে জাহাজেই বিশ্লেষণ করা যাবে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষণার তথ্য সরাসরি মূল ডেটা সেন্টারে পাঠানো সম্ভব হবে। একসঙ্গে ২৩ জন বিজ্ঞানী ও ক্রু সদস্য টানা ৮ থেকে ১০ দিন ২৪ ঘণ্টা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
গ্যাস হাইড্রেট ও খনিজ অনুসন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তি
জাহাজটিতে সংযোজন করা হচ্ছে সাব-বটম প্রোফাইলার, মাল্টি-বিম ইকো সাউন্ডার এবং সাইড-স্ক্যান সোনারের মতো আন্তর্জাতিক মানের উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্র। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রতলের নিচের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন, পলির স্তর, গ্যাস হাইড্রেটের সম্ভাব্য অবস্থান, মূল্যবান খনিজ সম্পদ এবং সমুদ্রতলের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র অত্যন্ত নির্ভুলভাবে তৈরি করা যাবে। এ ছাড়া সমুদ্রের পলি, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর নমুনা বিশ্লেষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস, সমুদ্রের কার্বন সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং সামুদ্রিক দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও গবেষণা করা হবে।
কক্সবাজারে নির্মাণ হচ্ছে জেটি ও পন্টুন
গবেষণা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে কক্সবাজারের খরুশকূলের মহেশখালী চ্যানেল এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে পন্টুন, জেটি ও গ্যাংওয়ে। এ ছাড়া উপকূলীয় অগভীর এলাকা, মোহনা এবং জরুরি উদ্ধার অভিযানে ব্যবহারের জন্য ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের দুটি উচ্চগতির স্পিডবোটও নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এগুলো বোরির কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। মূল গবেষণা জাহাজে রসদ সরবরাহ, নমুনা সংগ্রহ ও জরুরি সহায়তায় এগুলো ব্যবহার করা হবে।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিবেশ, ওশানোগ্রাফি ও জলবায়ু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, বর্তমানে দেশীয় নৌযানের সীমাবদ্ধতার কারণে গবেষণা মূলত উপকূলবর্তী অগভীর পানিতে সীমাবদ্ধ থাকে। নতুন গবেষণা জাহাজের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্র, সমুদ্রতল এবং বিভিন্ন গভীরতার পানির স্তরে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, এই জাহাজ বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ, সমুদ্রসম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং সুনীল অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত
সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণা জাহাজটি শুধু একটি বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো নয়, বরং দেশের সামুদ্রিক সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান ও টেকসই ব্যবস্থাপনার নতুন ভিত্তি। গভীর সমুদ্রের প্রকৃত সম্পদের নির্ভুল তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, সামুদ্রিক জীবসম্পদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। একই সঙ্গে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।