স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইঞ্জিনিয়ার হবে। একদিন মাকে বলেছিল, ‘আমি ইঞ্জিনিয়ার হবো, তুমি হবে একজন ইঞ্জিনিয়ারের মা।’ কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই নেমে এসেছে নির্মম বাস্তবতা। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থী ইবনে ছাবিদ এখন হাসপাতালের বিছানায় মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছে।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের দিয়ার সাহাপুর গ্রামের আশরাফুল আলম রোকন ও লিজা খাতুন দম্পতির একমাত্র সন্তান ইবনে ছাবিদ। বর্তমানে সে ঈশ্বরদী আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (আরএআরএস) উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে চর-সাহাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে কৃতিত্বের সঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করে সে।
তবে বৃত্তির আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গত এপ্রিলে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কিছুদিন পরই অসুস্থ হয়ে পড়ে ছাবিদ। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, সে ক্যান্সারে আক্রান্ত। বর্তমানে রাজধানীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়ার খবর শুনে আনন্দের পাশাপাশি অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে ছাবিদ ও তার পরিবার।
ছাবিদের প্রাক্তন শিক্ষকরা জানান, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়েছে সে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। শুধু লেখাপড়াই নয়, তার ভদ্র আচরণ, নিয়মিত নামাজ আদায় ও কোরআন তেলাওয়াত তাকে সবার প্রিয় করে তুলেছিল।
ছাবিদের বাবা আশরাফুল আলম রোকন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের মতে ছাবিদকে সুস্থ করে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রয়োজন। সীমিত আয়ে সেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও একমাত্র সন্তানের জীবন বাঁচাতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তিনি।
মা লিজা খাতুন বলেন, যে বয়সে ছাবিদের বই-খাতা নিয়ে স্কুলে থাকার কথা, সে বয়সে তাকে হাসপাতালের বেডে চিকিৎসার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তিরও শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। একমাত্র সন্তানকে সুস্থ করে তুলতে তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া ও আর্থিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, ছাবিদ শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার গর্ব। তার মেধা ও স্বপ্ন আজ ক্যান্সারের কাছে থমকে গেছে। সময়মতো উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে সে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে বলে তাদের বিশ্বাস।
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, ক্যান্সার আক্রান্তদের সহায়তায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় সরকারি সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। ছাবিদের পরিবার আবেদন করলে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।
একসময় যে ছেলেটি দেশ ও সমাজের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখত, আজ তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—সুস্থ হয়ে আবার স্কুলে ফেরা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের সহযোগিতার অপেক্ষায় রয়েছে ছাবিদের পরিবার।