‘জেলে থাকতি দুবেলা খাওন পাইতাম, এখন অনেক সময় না খাইয়া থাকতি হয়। জেল থেকে মুক্তি পাইছি, কিন্তু জীবন পাই নাই।’ বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার লখপুর ইউনিয়নের ভাবনা খড়িবুনিয়া গ্রামের ইব্রাহিম আলী শেখের কণ্ঠে এই আক্ষেপ যেন ২১ বছরের কারাবাসের পর তার বদলে যাওয়া জীবনের পুরো গল্প বলে দেয়। দুই দশকের বেশি সময় কারাগারের অন্ধকারে কাটিয়ে মুক্তি পেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি। হারিয়েছেন যৌবনের সোনালি সময়, সংসার, স্ত্রী-সন্তানের সান্নিধ্য। এখন নিজের বলতে কিছুই নেই। না জমি, না ঘর, না কোনো আয়ের পথ।
ফকিরহাট উপজেলার মরা পশুর নদীর চরের খাসজমিতে ভগ্নিপতির তৈরি ঝুপড়ি ঘরে বৃদ্ধ মা কোহিনূর বেগমকে নিয়ে কোনোরকমে দিন কাটছে ইব্রাহিমের। শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিয়মিত কাজও করতে পারেন না। কখনো কাজ জোটে, কখনো জোটে না। যার কারণে অনেক সময় অর্ধাহারে-অনাহারেই কাটে মা-ছেলের দিন।
ইব্রাহিমের চাওয়া খুব বেশি নয়—একটি কাজ, মাথা গোঁজার মতো একটি স্থায়ী ঠিকানা কিংবা এমন কোনো ব্যবস্থা, যাতে জীবনের বাকি সময়টুকু কারও বোঝা হয়ে না থেকে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারেন।
ইব্রাহিম জানান, ২০০৩ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি। একই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় নিজের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য ছিল না। পরে বিভিন্ন মামলায় মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয় তার।
কারাগারে থাকা এক কয়েদির পরিবারের সহযোগিতায় পরে উচ্চ আদালতে আপিল করেন ইব্রাহিম। ২০১৭ সালে হত্যা ও যাবজ্জীবন মামলায় খালাস পান তিনি। অন্য দুটি মামলার সাজাও ততদিনে কারাভোগ করে শেষ করেন।
কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি তার দুর্ভোগ। খালাসের আদেশ কারাগারে পৌঁছায়নি। যার কারণে খালাস পাওয়ার পর আরও প্রায় আট বছর কারাগারে থাকতে হয় তাকে।
অবশেষে অর্থের বিনিময়ে পরিবারের তদবির এবং কারা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান ইব্রাহিম।
২১ বছর পর কারাগারের দরজা খুলে বাইরে এসে ইব্রাহিম দেখেন, আগের সেই পৃথিবী আর নেই। নেই সংসার, নেই উপার্জনের সক্ষমতা। স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। যে সন্তানকে মাত্র দুই মাস বয়সে রেখে কারাগারে গিয়েছিলেন, সেই সন্তান এখন বড় হয়ে বিয়ে করেছেন।
আরেক সন্তান মেয়ের জীবনও তার কারাবাসের কারণে কঠিন হয়ে উঠেছে। ইব্রাহিম বলেন, তার অনুপস্থিতিতে বৃদ্ধ মা মেয়েকে বড় করেছেন। কিন্তু বাবার ‘আসামি’ পরিচয় মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইব্রাহিম বলেন, ‘আমি মিথ্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে জেলে ছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে আর আমার ছোট মেয়েকে ফেলে গেছে। আমার দরিদ্র মা মেয়েটাকে মানুষ করেছে। বড় হওয়ার পর ভালো কোনো পরিবার বিয়ের জন্য এগিয়ে আসেনি। সবাই বলত, বাপ খুনি, মা চলে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘জেলে থাকতেই শুনছিলাম, বাধ্য হয়ে আমার মা মেয়েকে একটা অতি দরিদ্র পরিবারে বিয়ে দিয়েছে। মুক্তির পর এসে দেখি, মেয়েও অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। জেলে জীবন শেষ করা একজন অক্ষম বাবা হয়ে মেয়ের এই কষ্ট দেখা মৃত্যুর চেয়েও ভারী।’
কারাগারে যাওয়ার আগে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন ইব্রাহিম। দিনে রিকশা চালাতেন, রাতে বাজারে নাইটগার্ডের কাজ করতেন। নিজের মা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ করতেন তিনি।
দীর্ঘ ২১ বছরের কারাবাসে সেই জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। দীর্ঘদিন কনডেম সেলের অন্ধকারে থাকার প্রভাব পড়েছে তার শরীরেও। এখন আলো সহ্য করতে পারেন না, চোখে কম দেখেন। হাত-পা অনেকটা অসাড় হয়ে গেছে। বয়সের তুলনায় শরীরে যেন আগেভাগেই বার্ধক্য নেমে এসেছে। ভারী কাজ তো দূরের কথা, স্বাভাবিক কাজ করতেও কষ্ট হয়।
ইব্রাহিম বলেন, ‘মানুষ কাজও দিতে চায় না। কাজ করার শক্তিও নাই। নিয়মিত কোনো আয় নাই। অনেক সময় বৃদ্ধ মাকে নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে থাকতে হয়। দরিদ্র ভগ্নিপতির পরিবারও আর কতদিন আমাদের চালাবে?’
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বলেন, ‘গরিব আছিলাম, তাই নিজেরে বাঁচাইতে পারি নাই। মিথ্যা মামলায় ২১ বছর জেল খাটলাম। তার মধ্যে খালাস পাওয়ার পরও আটটা বছর ফাও জেলে থাকলাম। এখন সরকারের কাছে আমার একটা দাবি—আমারে বাঁচার একটা ব্যবস্থা করে দিক।’
ইব্রাহিমের বৃদ্ধ মা কোহিনূর বেগম বলেন, ২১ বছর পর ছেলেকে ফিরে পেয়ে তিনি আনন্দিত হলেও ছেলের বর্তমান অবস্থা দেখে কষ্ট পান। ছেলেকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে তিনি ইটভাটায় ও অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন। এমনকি বটিয়াঘাটায় থাকা নিজের ঘরটুকুও বিক্রি করতে হয়েছে।
এখন জামাইবাড়িতে ছেলেকে নিয়ে থাকছেন তিনি। কিন্তু ইব্রাহিম শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল যে নিজের ও মায়ের খাবারের ব্যবস্থাও নিয়মিত করতে পারেন না।
ইব্রাহিমের দুর্দশার কথা জানতে পেরে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন তার পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, ইব্রাহিম আলী শেখের চাহিদা ও সক্ষমতা অনুযায়ী কাজের ব্যবস্থা করা হবে। ফকিরহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে তার কাছে পাঠিয়ে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, সরকারের যে সক্ষমতা রয়েছে, তার মধ্য থেকে ইব্রাহিমকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।