নির্বাচনি হালচাল (কুষ্টিয়া-৩)
কুষ্টিয়া সদর ও ইবি থানা নিয়ে নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন নং ৭৭ (কুষ্টিয়া-৩)। ভৌগলিক বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক কারণে আসনটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ৩১৬.২৬ বর্গকিলোমিটারের এই আসন ১৩ ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৩৮ জন । এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ২৩হাজার ৫৭৫ জন আর পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ২৫৯ জন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ২৮ দিন বাকি। এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি ভোট যুদ্ধে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এই আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সাবেক সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার। জামায়াত ইসলামীর দাড়ীপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ এবং আলোচিত বক্তা মুফতি আমির হামজা।
এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে হাত পাখা প্রতীকে মো: আব্দুল্লাহ্ আখন্দ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দোয়াল ঘড়ি প্রতীকে মো. সিরাজুল হক, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) ট্রাক প্রতীকে মোহা: শরিফুল ইসলাম, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) হাতী প্রতীকে মোছা: রুম্পা খাতুন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল(বাসদ) মই প্রতীকে মীর নাজমুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত (দ্বাদশ) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেভিওয়েট নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ। আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর হানিফসহ আওয়ামীলীগের প্রথম সারির সব নেতাই গত বছরের ৫ আগষ্টের পর থেকে লাপাত্তা। দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় সব মিলিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মকাণ্ড নেই।
এক সময় বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল কুষ্টিয়ার চারটি আসন। ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত এখানকার সবকটি আসনই ছিল বিএনপির দখলে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দুর্গে আঘাত হেনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন খন্দকার রশীদুজ্জামান দুদু। তার মৃত্যুর পর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে এখানকার সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফ।
২০২৪ এর ৫ আগষ্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর লাপাত্তা হয়ে যান মাহাবুব-উল আলম হানিফ। সেই সাথে পালিয়ে যায় তার নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগ শুন্য এক প্রকার ফাঁকা মাঠে নির্বাচনে অনেকটাই নির্ভার অবস্থায় রয়েছে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাকির হোসেন সরকার। যদিও দলীয় মনোনয়নসহ কিছু বিষয় নিয়ে বিএনপির মধ্যে বিরোধ চলছিল তবে সেটি অবসান ঘটেছে গেল কয়েকদিন আগে।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী হিসেবে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছে। প্রথম দিকে জামায়াতে ইসলামী কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় সূরা সদস্য অধ্যাপক ফরহাদ হুসাইনের নাম ঘোষণা করে। পরবর্তীতে তার জায়গায় বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ এবং আলোচিত বক্তা মাওলানা আমির হামজাকে চুড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।
ভোটারা বলছেন, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সৎ নেতৃত্ব, এলাকার বাস্তব উন্নয়ন ও জনগণের পাশে থাকার মানসিকতাকে। দীর্ঘদিনের অবহেলা,রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচার এই বিষয়গুলোই তাদের প্রধান চাওয়া।
বিএনপি প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘আমাদের অনেক বড় দল, অনেক যোগ্য নেতাকর্মী আছে। অনেকেই দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিল। কিন্তু তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়নি। আমরা সবাই শহীদ জিয়ার আদর্শের রাজনীতি করি। আর আমাদের আদর্শের প্রতীক ধানের শীষ। যারা বিএনপিকে ভালোবাসে,বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে ভালোবাসে তারা ধানের শীষের বিরুদ্ধে যেতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই। এই আসনকে একটি সুন্দর এবং মাদক, সন্ত্রাস মুক্ত করতে নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। ইনশাআল্লাহ এ আসনের জনগণ বিপুল ভোটে ধানের শীর্ষকে বিজয়ী করে সংসদে পাঠাবেন।’
জামায়াত প্রার্থী আমির হামজা বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর মানুষ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছেন। আমি মনে করি, মানুষ আমাকে বিপুল ভোটের ব্যাবধানে বিজয়ী করবেন। কারণ আমরা মানুষের কাছে যাচ্ছি, কথা বলছি। দেশের জনগণ ৫ তারিখের পর বুঝে গেছে একটি দল কতটা তাণ্ডব চালাতে পারে। তাই তারা দেশের শান্তি বজায় রাখার জন্য দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে উদগ্রীব হয়ে আছেন।’
অন্যান্য দলের প্রার্থী থাকলেও মুলত লড়াই হবে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আমীর হামজার। দিন যত গড়াচ্ছে লড়াইয়ের আভাস ততটাই শক্ত হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কতটা লড়াই হবে এবং শেষ পর্যন্ত কে জয়যুক্ত হবে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষায় এ আসনের মানুষ।