পাহাড়ি জনপদ জঙ্গল সলিমপুর। চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীত পাশেই বাইপাস মোড়। এই মোড় থেকেই পাকা সড়ক ধরে সিএনজিতে মাত্র আধ ঘণ্টার পথ ছিন্নমূল বা জঙ্গল সলিমপুর। এই জঙ্গল সলিমপুরকে বলা হয় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। একের পর এক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে জঙ্গল সলিমপুরের নাম।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় র্যাব-৭ এর উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) আব্দুল মোতালেব নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হয়েছিলেন আরও বেশ কয়েকজন।
সম্প্রতি ২৪ মে, রোববার দিনগত রাত ১টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে নবনির্মিত র্যাব ক্যাম্পের সবার ঘুম ভাঙে। ভারী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কয়েকশ দুর্বৃত্ত চারপাশ থেকে ক্যাম্পটি ঘিরে ফেলে অতর্কিত গুলি চালায়। সেইসঙ্গে তারা বুলডোজার দিয়ে নবনির্মিত র্যাব ক্যাম্পের দেয়াল ও স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়। পরিকল্পিত এই হামলার অংশ হিসেবে দুর্বৃত্তরা জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশের প্রধান সড়কের কয়েক জায়গার মাটি কেটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এসময় আশেপাশের বেশ কিছু সাধারণ মানুষের বসতঘর ও স্থাপনাতেও ভাঙচুর চালানো হয়। পরে র্যাবের পাল্টা প্রতিরোধের মুখে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে প্রচণ্ড গোলাগুলির পর পিছু হটে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
এর আগে চলতি বছরের ৯ মার্চ জঙ্গল সলিমপুরে সাঁড়াশি অভিযান চালায় যৌথবাহিনী। ওই দিন এই যৌথ অভিযানে বাহিনীতে প্রায় ৪ হাজার সদস্য অংশ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল। কিন্তু যৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখেই চলছিল স্থানীয়দের পাহাড় কেটে বসতি স্থাপনের কর্মজজ্ঞ।
১৯ জানুয়ারি (সোমবার) র্যাব-৭ এর উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) আব্দুল মোতালেব নিহত হওয়ার পর ২৫ শে জানুয়ারি (রোববার) চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে যান নাগরিক প্রতিদিনের এই প্রতিবেদক। তবে স্থানীয়দের কেউই ক্যামেরার সামনে সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের বিষয়ে কথা বলতে চাননি। পরে ক্যামেরা বন্ধ করে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া যায় জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসী বাহিনীর এক অজানা অধ্যায়।
জানা যায়, গত চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকাটি সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় রাখে এই সন্ত্রাসীরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে তিন হাজার একর সরকারি ভূমির ভাগবাটোয়ারা আর দখলদারিত্ব। ৩৭টি পাহাড় এবং আটটি টিলায় থাকা এই ভূমি প্লট আকারে বেচাকেনা করছে সেখানকার কিছু ভূমি দস্যু। যখন যার ক্ষমতা থাকে তখন তার আশ্রয়ে গিয়ে এই বাণিজ্য পরিচালনা করে তারা। আগে আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে যারা ছিল, তারাই এখন ছায়া খুঁজছে বিএনপির। রাজনীতিকেরা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে সেখানে বেপরোয়া ভূমি দস্যুরা। জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় পায় প্রশাসন থেকেও। তবে গত দুই দশকে এখানে ডজনেরও বেশি মানুষ খুন হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ৫ আগস্টের পর লাশ পড়েছে ৫টির অধিক।
প্রতিটি খুনের পর অভিযান পরিচালনা করে প্রশাসন। কিন্তু সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করতে পারেনি তারা। অভিযানে কিছু অস্ত্র উদ্ধার, কিছু সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হলেও বাহিনীপ্রধানদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন। তাই ইয়াসিন, মশিউর, ফারুকরা গ্রেপ্তার হলেও বের হয়ে যায় জামিনে। বন্ধ হয় না সেখানকার হানাহানি। বন্ধ হয় না পাহাড় কাটাও। প্রশাসনের চোখের সামনেই সাবাড় হয়েছে সেখানকার ৩৭টি পাহাড়। বসতি গড়ে উঠেছে ৫০ হাজার মানুষের। সেখানে সংযোগ আছে বিদ্যুতের। ব্যবস্থা আছে পানিরও।
দুই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে সাম্রাজ্য
স্থানীয়রা জানান, দেশের জন্য নির্দিষ্ট আইন-আদালত থাকলেও জঙ্গল সলিমপুরে থাকা ৫০ হাজার মানুষের কাছে রোকন ও ইয়াসিনের কথাই আইন। এখানকার বাসিন্দাদেরও প্রবেশ করতে লাগে বাহিনী প্রধানের স্বাক্ষরিত পাস। আগে এই পাস দিতেন চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি গাজী সাদেকুর রহমান, সেক্রেটারি কাজী মশিউর রহমান ও সলিমপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য গোলাম গফুর। ৫ আগস্টের পর এরা রোকন বাহিনীর সঙ্গে আছে। এই বাহিনীতে আরও আছে মামুন, মঞ্জুরুল, রাজু, ইলিয়াছ, লুৎফর, মাহিদ, নুরুল আলম মনা, রনি, কাসেম, সোহেল, রামেদ ও বেলাল।
অন্যদিকে আলীনগর সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রণ করছে সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাকিম, সেক্রেটারি মো. ইয়াসীন, তার ভাই মো. ফারুক, হাসান, জামাই ফারুক, নুরুল হক ভাণ্ডারী, জেলাল, জামাই ইয়াছিন, বেদা মামুন, শাহেদ আলী, মেজবাহ, শাহিন ও নুর হোসেন। এখন এদের পদবি পরিবর্তন হয়েছে। দলও পরিবর্তন করেছে তারা। ক্ষমতার পালাবদলে দুই বাহিনীপ্রধান হয়েছেন রোকন উদ্দিন ও ইয়াসিন মিয়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দুই বাহিনী প্রধানের কথা ছাড়া পাতাও নড়ে না ৩৭ পাহাড়ে।
সরকারি প্রতিবেদনে জঙ্গল সলিমপুর
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীতাকুণ্ডের সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুহুল আমিন জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। কেটে ফেলা পাহাড়গুলোর কোনটি কোন বিএস দাগ নম্বরে, সেটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিবেদনে ভূমিদস্যুরা ৩৭টি পাহাড় ও আটটি টিলা কেটে কোথায় কী স্থাপনা গড়ে তুলেছে, সেটিও উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জঙ্গল সলিমপুরে ৩৪টি পাহাড় ও আটটি টিলা কেটে চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ ১৩ হাজার ৯০০ প্লট তৈরি করে। তিনটি কেজি স্কুল, একটি প্রাইমারি স্কুল, একটি হাই স্কুল, একটি কাঁচাবাজার ও প্রায় ৪০০ দোকানও করা হয়েছে। প্রতিটি পাহাড়ে ৫ শতাধিক পরিবার আছে। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যেতে এখানে ছয়টি ব্রিজ ও ১৫টি কালভার্টও নির্মাণ করা হয়েছে। একইভাবে ‘আলীনগর সমবায় সমিতি’ নামে আরেকটি সংগঠন তিনটি পাহাড় কেটে গড়ে তুলেছে প্রায় পাঁচ হাজার প্লট।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেই হামলা
২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল বড়ইতলা ২ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলায় জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছিলেন। এর আগের বছর ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে র্যাবের গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২ আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের লোকজনকে বাধা দেওয়া হয়। আবার ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আলীনগর এলাকায় অবৈধ বসতি উচ্ছেদে গেলে সেখানকার সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। সেখানে সংবাদ সংগ্রহের কাজে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন একাধিক সাংবাদিকও। ২০১৯ সালে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে নিহত হন র্যাব-৭ এর উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) আব্দুল মোতালেব।
সর্বশেষ ২৪ মে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব ক্যাম্পে ইয়াসিন বাহিনীর তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে। নবনির্মিত র্যাব ক্যাম্পে ভারী অস্ত্রস্বস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় দৃর্বকৃত্তরা। বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয় ক্যাম্পের দেয়াল ও স্থাপনা।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত ঈদের নিরাপত্তা বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইয়াসিন বাহিনী কি র্যাবের চেয়ে বেশি শক্তিশালী? - এমন প্রশ্নের উত্তরে র্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবিব পলাশ বলেন, আর কোনোভাবেই সন্ত্রাসীরা সেখানে ঢুকতে পারবে না। হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ সময় নিজেদের দুর্বলতার কথা স্বীকার করে র্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘ইয়াসিন বাহিনী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে- এটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। তারা অতর্কিত কাজটা করেছে। পর্যাপ্ত মনিটরিং ছিল না বলেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোববার রাতে যে ঘটনা ঘটেছে তা অসাবধানতাবশত হয়েছে। কিন্তু তারা এখানে আসতে পারবে না। তাদের সেই শক্তি নেই। তারা যেখানেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক, তাদের উচ্ছেদ করা হবে। তারা কোনোভাবেই সেখানে ঢুকতে পারবে না।’