স্বাস্থ্যসেবা নয়, যেন জালিয়াতির আখড়া
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। বাইরে থেকে পরিপাটি আর ‘যাকাত ও সেবামূলক’ প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ঝোলানো থাকলেও, ভেতরে লুকিয়ে আছে এক নরককুণ্ড। যেখানে স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী আকস্মিক অভিযানে গিয়ে খুঁজে পেয়েছেন দুর্গন্ধযুক্ত পানি আর অবৈধ বেকারি! আর এই বেকারির নোংরা পরিবেশের কারণেই হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার পরিণত হয়েছে মাছি আর তেলাপোকার অভয়ারণ্যে। সম্প্রতি একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসছে কেউটে সাপ। ঘটনার সত্যতা ঢাকা দিতে সাংবাদিকদের ওপর বর্বরোচিত হামলাও চালিয়েছে হাসপাতালের স্টাফরা। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের আদ্যোপান্ত নিয়ে নাগরিক প্রতিদিন-এর বিশেষ অনুসন্ধান।
জানা যায়, হাসপাতালের ভেতরেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি বেকারি। আর এই বেকারির কারণে পুরো হাসপাতালের হাইজিন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, ওটি-তে অপারেশন চলাকালীন ক্ষত স্থান, ড্রাপিং শিট, এমনকি প্রসূতি মায়ের জরায়ুর ওপরও অহরহ মাছি এসে বসে! সার্জনদের হাতের গ্লাভস, অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি ও ট্রলিতে মাছি আর তেলাপোকা ঘুরে বেড়ানোর মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও নোংরা পরিবেশে বছরের পর বছর ধরে চলছে অস্ত্রোপচার।
কোনো নকশা বা কাঠামোর তোয়াক্কা না করে যেদিক দিয়ে পেরেছে সেদিকেই এক্সটেনশন বিল্ডিং বানিয়ে পুরো হাসপাতালকে একটি গোলকধাঁধায় পরিণত করেছে কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে গুরুতর নির্মাণ ত্রুটি পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, হাসপাতালটিতে ব্যবহার করা হচ্ছে স্প্লিট এসি। কারিগরি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী হাসমতুজ্জামান জানান, ‘ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী হাসপাতালের ক্লিন স্পেসের জন্য কোনো স্প্লিট, ভিআরএফ বা উইন্ডো টাইপ এসি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ, এসব এসির গ্যাস লিকেজ হলে ভেতরে থাকা অসুস্থ রোগীরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে বের হতে পারবে না এবং মুহূর্তেই আক্রান্ত হবে।’ আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ জেনেশুনে রোগীদের জীবনকে এমন চরম ঝুঁকিতে ফেলে রেখেছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা অন্তত দুঃখজনক।’
এদিকে নিজেদের অপরাধ লুকাতে গত শনিবার সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত ও বর্বরোচিত হামলা চালায় হাসপাতালের স্টাফরা। এ ছাড়া হাসপাতালটির বিরুদ্ধে কর্মচারীদের বেতন থেকে ‘যাকাত’-এর নামে জোরপূর্বক টাকা কেটে রাখার মতো গুরুতর আর্থিক শোষণের অভিযোগও সামনে এসেছে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম অপরাধ নয়। এর আগেও হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনা এবং এনআইসিইউ থেকে জীবিত শিশু সন্তান পরিবর্তনের মতো একাধিক ভয়ঙ্কর ও সংবেদনশীল অভিযোগ রয়েছে।
তবে যথারীতি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন। তিনি দাবি করেন, ‘সব নিয়ম মেনেই কার্যক্রম চলছে।’ একই সুরে সুর মিলিয়ে হাসপাতালের পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘চিকিৎসা বিধান মেনেই সব সম্পন্ন করা হচ্ছে।’
গত বুধবার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি অপারেটিভ ওয়ার্ডে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উচ্চপর্যায়ের ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা এবং মারা যাওয়া শিশুদের মায়েদের বক্তব্য সময়মতো নিতে না পারায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় আরও চারদিন পিছিয়ে আগামী ৩ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে তদন্ত কমিটিতে আরও তিন নতুন সদস্যকে যুক্ত করে এর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এদিকে সন্তান হারানো এক নবজাতকের বাবা হাবিবুর রহমান গত বুধবার রাতেই রাজধানীর রমনা থানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার অভিযোগ এনে মামলা করেন। এরপর থেকেই হাসপাতালের অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী পুলিশের কড়া নজরদারিতে রয়েছে। বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও এখনো কাউকে আটক করা হয়নি।
ছয়টি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুর পেছনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা আর ওটি-র ভেতরে মাছি-তেলাপোকার এই নোংরা সিন্ডিকেটকে আইনের মুখোমুখি করতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।