সরকার নতুন অর্থবছরের বাজেট দেবে যথারীতি জুন মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহেই। বাজেট নিয়ে আগে অতটা উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল না। কিন্তু প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষজনও বেশ উৎসাহী এখন। দেখা যায় এই বাজেট নিয়ে ফুটপাতের টংদোকানেও দিনভর আলোচনা।
বাংলাদেশের বাজেট আসলে শুধু অর্থনীতিবিদদের বিষয় না, এটা প্রত্যেক মানুষের জীবন, বাজার, চাকরি, বিদ্যুৎ বিল, মোবাইল ইন্টারনেট, চাল-ডাল, বাসাভাড়া, সবকিছুর সঙ্গেই জড়িত।
বাজেট মানে আসলে কী?
সহজ ভাষায় বলা যায়, একটি পরিবার যেমন মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব করে, রাষ্ট্রও বছরে একবার সেটাই করে। সরকার কত টাকা আয় করবে, কোথায় খরচ করবে, কোথা থেকে ঋণ নেবে, এই পুরো পরিকল্পনার নাম বাজেট।
এবারের বাজেট নিয়ে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। গত কয়েক বছরে মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছে বাজারদরের কারণে। চাল, ডিম, মাংস, তেল, ভাড়া—সবকিছু বেড়েছে। তাই মানুষ এখন বড় বড় মেগা প্রকল্পের চেয়ে জানতে চায়, আমার বাজার খরচ কমবে কি? মূল্যস্ফীতি যে হারে চলছে সে হিসাবে আমার যে আয় তাতে করে আমার ব্যয়ের ওপর কি বাড়তি কোনো মূল্য চেপে বসবে?
বাংলাদেশের বাজেটের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষা এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার পরিচালনায় আয় কম, কিন্তু খরচ অনেক বেশি। সরকার মূলত কর থেকে টাকা আয় করে সেটা মেটায়। কিন্তু বাংলাদেশে যারা কর দেয়, তাদের সংখ্যা খুব কম। একই মানুষ বারবার কর দেয়, অথচ বিশাল একটি অংশ করের বাইরে থাকে। ফলে সরকারকে ঋণ নিতে হয়। এখানেই আসে বাজেট ঘাটতির কথা। বিষয়টি সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায়, ধরুন মাস শেষে আয় ৫০ হাজার, কিন্তু খরচ ৭০ হাজার। তাহলে সেই পরিবারের চলতে বাকি ২০ হাজার টাকা ধার করে, রাষ্ট্রও তেমনি ধার করে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই ধার কোথা থেকে আসে?
এটা আসে দুটি বড় উৎস: ব্যাংক আর বিদেশি ঋণ। ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে সমস্যা হয় কী? তখন বেসরকারি ব্যবসায়ীরা ঋণ কম পায়। কারণ ব্যাংকের টাকা সরকার নিয়ে নিলে তারা নেবে কীভাব? এটাকে অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন ক্রাউডিং আউট। ব্যাংকের টাকার সরকারই যদি বড় গ্রাহক হয়ে যায় তখন ছোট ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে যায়।
বিদেশি ঋণের জায়গাটাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আগে কম সুদে প্রচুর বিদেশি ঋণ পেত। এখন বিশ্ব পরিস্থিতি বদলেছে। ডলার সংকট আছে, রপ্তানির চাপ আছে, আবার ঋণ পরিশোধও বাড়ছে। ফলে সরকার এখন আগের মতো স্বস্তিতে নেই।
সরকার যদি বলে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে, তার মানে হলো দেশের অর্থনীতি আরও বড় হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হলো, দেশের অর্থনীতি বড় হলে জনগণের জীবনে কী বদলাবে? এখানেই আসল আলোচনা। কারণ শুধু জিডিপি বাড়লেই হবে না, মানুষের আয়, চাকরি আর জীবনযাত্রাও ভালো হতে হবে।
কাগজের উন্নয়ন বনাম বাস্তব উন্নয়ন একেবারেই আলাদা। ধরুন, রাস্তাঘাট, মেট্রোরেল, বড় বড় সেতু এসব দৃশ্যমান উন্নয়ন হলো। কিন্তু যদি একজন তরুণ চাকরি না পায়, একজন পরিবার বাজার করতে না পারে, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল মানুষ পুরোপুরি অনুভব করতে পারবে না।
এবারের বাজেটে ব্যাংক খাতও বড় আলোচনায় থাকবে। কারণ খেলাপি ঋণ এখন বিশাল সমস্যা। সহজ ভাষায় খেলাপি ঋণ মানে, ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফেরত না দেওয়া। সাধারণ মানুষ ছোট ঋণের জন্য কষ্ট পায়, অথচ বড় বড় প্রভাবশালী গ্রুপ হাজার কোটি টাকা আটকে রাখে, এই বিষয়টি মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টাকার মান কমে যাওয়া। আগে ১০০ টাকায় যা পাওয়া যেত, এখন তা পাওয়া যায় না। সেই জিনিস কিনতে দেড়শ বা দুইশ টাকা হয়তো লাগছে। কিন্তু মানুষের আয় কি বেড়েছে? বাড়েনি। বা ধরুন, কারো বেতন হয়তো পাঁচ হাজার বেড়েছে, কিন্তু বাজার খরচ বেড়েছে ১০ হাজার। এখানেও ঘাটতি। এটিই মূল্যস্ফীতির বাস্তব অনুভূতি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, তেলের দাম, ডলারের দাম, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ, এসব বাংলাদেশের বাজেটেও প্রভাব ফেলে। কারণ বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর একটি দেশ। জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্যের দামও বাড়ে।
ফলে বাজেট আসলে শুধু অর্থমন্ত্রীর একটি লম্বা বক্তৃতা না। এটা আসলে বলে দেয়, আগামী এক বছরে রাষ্ট্র কাদের বেশি গুরুত্ব দেবে, ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্ত, নাকি সাধারণ মানুষদেরকে।