সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এতে দেশীয় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশটির আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ২০ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে চুক্তির বিস্তারিত জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ নং ১৪২৫৭ বলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের উপর বিভিন্ন হারে যুক্তরাষ্ট্র রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ (আরটি) আরোপ করে। এর পরপরই বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে পত্র পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উক্ত শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে।
যুক্তরাষ্ট্র আরটি আরোপের পর একটি অভিন্ন আরটি চুক্তির খসড়া প্রায় সব বাণিজ্য অংশীদার দেশকে পাঠায়। যে সব দেশ উক্ত চুক্তির ওপর আলোচনায় অংশ নেয়, তাদের ওপর আরোপিত শুল্ক হার কমিয়ে ৩০ আগস্ট একটি সংশোধিত আরটি হার নির্ধারণ করে; যা বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হয় ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারষ্পরিক শুল্ক আরোপের পর অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। গত ৯ মাস ধরে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনা এবং নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সফলভাবে দর কষাকষি করে পারষ্পরিক শুল্ক হার ১৯ শতাংশ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দেয়।
এ কাজে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। বিভিন্ন বহুমাত্রিক বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ গ্রহণ করে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। আরটি চুক্তিতে পণ্য, সেবা, বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, লেবার, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ সব বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশ আগে থেকেই ডব্লিউটিও ট্রিপস চুক্তি অনুস্বাক্ষর করায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরটি চুক্তিতে নতুন কোনো শর্ত আরোপিত হয়নি। অন্যান্য বিষয়ে বাংলাদেশ আগেই আইএলও, ট্রিপস ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। আরটিতে উক্ত চুক্তির বিধানাবলি বাস্তবায়নে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে সব পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে, সেসব পণ্য অন্য উৎস হতে ক্রয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য হওয়ায় সে বাজার ধরে রাখার জন্য তাদের বাজার থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে; এতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। শুধুমাত্র উৎসের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি বাজার সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চুক্তিতে ট্রেক্সটাইল ও পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে এবং তা ব্যবহার করে তৈরি করা পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির ক্ষেত্রে শূন্য আরটি হারে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে পোশাক খাতে প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত হবে। এ ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক যোগ হবে না।
চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
১. যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫টি দেশের সঙ্গে রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ চুক্তি সম্পাদন করেছে। ভারত ও জাপানের সঙ্গে জয়েন্ট ডিক্লারেশন সম্পন্ন হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষর অপেক্ষমান। যে সব চুক্তি অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাগ্রিমেন্ট অন বিডি-ইউএস রিসিপ্রোকাল ট্রেডের কিছু মিল রয়েছে।
কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। যেমন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে বলা হয়েছে ওই দুইটি দেশ ডিজিটাল ট্রেড সংক্রান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাইলে সেক্ষেত্রে তাদেরকে উক্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্তকৃত এআরটির খসড়াতে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।
২. রুলস অব অরিজিনের টেক্সটের মধ্যে ফরেন বা ডমেস্টিক ভ্যালু অ্যাডিশনের পরিমাণ নির্ধারিত নেই। ফলে টেক্সট অনুযায়ী পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া সহজ হবে।
৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা এবং ম্যান-মেড ফাইবার টেক্সটাইল ইনপুটস ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য উক্ত দেশে রফতানির ক্ষেত্রে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা (মার্কেট অ্যাক্সেস) দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সম্পাদিত অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেডে (এআরটি) উল্লেখ নেই। এখানে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
৪. এ চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ২ হাজার ৫০০ টি পণ্যের শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা (মার্কেট অ্যাক্সেস) দেয়ার ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইন/এইচএস কোডকে অফার লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অফার লিস্টের সার-সংক্ষেপ হলো-
৪৯২২টি ট্যারিফ লাইনকে চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হবে (উল্লেখ্য, এর মধ্যে ৪৪১টি ট্যারিফ লাইনের শুল্কহার এরইমধ্যে শূন্য রয়েছে)।
১ হাজার ৫৩৮টি ট্যারিফ লাইনের শুল্কহার ৫ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০ শতাংশ হ্রাস এবং পরবর্তী ৪ বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে)।
৬ হাজার ৭২টি ট্যারিফ লাইনের শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০ শতাংশ হ্রাস এবং পরবর্তী ৯ বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে)।
৩২৬টি ট্যারিফ লাইনকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া হয়নি (এর মধ্যে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত সিইপিএ’র অফার লিস্টের ৮১টি ইএমএফএন ট্যারিফ লাইনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)। তবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পাদিত এআরটিতে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের এআরটিতে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে।
৫. এআরটি পেপারলেস ট্রেড ফোর, আইপিআর এনফোর্সমেন্ট, ই-কমার্স পার্মানেন্ট মোরাটোরিয়াম সমর্থন, নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার ও টিবিটি হ্রাস, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, কনফরমিটি অ্যাসেসমেন্ট সার্টিফিকেট, গুড গভর্ন্যান্স ও নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরস, ফুয়েল রডস, অর এনরিচড ইউরেনিয়াম ক্রয় ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ৯টি আইপিআর সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি অ্যাকসেশন প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করা হয়েছে।
৬. এআরটিতে ই-কমার্সে পার্মানেন্ট মোরাটোরিয়ামকে সমর্থন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেডিক্যাল ডিভাইস ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে সেই দেশের এফডিএ’র সনদ থাকা সাপেক্ষে মার্কেট অথরাইজেশনের পূর্ব অনুমতি ছাড়া আমদানির সুযোগ; এফএমভিএসএসকে স্বীকৃতি; রিম্যানুফ্যাকচার গুডস আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা; খাদ্য ও কৃষি পণ্য আমদানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এসপিএস মেজার্সকে স্বীকৃতি দেওয়া; ডেইরি প্রোডাক্টস, মাংস ও পোল্ট্রি প্রোডাক্ট আমদানিতে মার্কিন সনদকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে।
অ্যাগ্রিকালচারাল বায়ো-টেকনোলজি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন, উক্ত প্রযুক্তির খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যকে (নন-লিভিং মডিফায়ড অর্গানিজমস না থাকা শর্তে) স্বীকৃতি; জীবন্ত পোল্ট্রি ও এর সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং এমআরএলকে স্বীকৃতি; প্ল্যান্ট অ্যান্ড প্ল্যান্ট প্রোডাক্টসের আমদানিতে মার্কেট অ্যাক্সেস প্রক্রিয়া ২৪ মাসের মধ্যে সম্পাদন; ইন্স্যুরেন্স, তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা লিবারালাইজ করা, এন্টিকরাপশন সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, ডব্লিউটিওর অ্যাগ্রিমেন্ট অন ফিশারিজ সাবসিডি গ্রহণ করা ও ইলিগ্যাল আনরিপোর্টেড অ্যান্ড আন্ডাররেগুলেটেডের (আইইউইউ) ক্ষেত্রে সাবসিডি না দেওয়া, পরিবেশ রক্ষায় এ সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, বনজ সম্পদ ও ওয়াইল্ডলাইফের অবৈধ ট্রেড বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ; আন্তর্জাতিক লেবার সংক্রান্ত বিধি-বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের লেবার ল’কে হালনাগাদ করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. ডিজিটাল ট্রেড ও টেকনোলজিতে সিবিপিআর, পিআরপি, পিডিপিও ইত্যাদি বিষয়কে স্বীকৃতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইকোনোমিক ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইস্যু সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উক্ত দেশ থেকে বোয়িং ক্রয়, এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা, সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বাড়ানোর প্রচেষ্টা করার বিষয়গুলো খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
৮. কোনো দেশের পক্ষেই চুক্তি শেষ করার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশ চুক্তিতে এক্সিট ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে প্রেস উইং আরও জানায়, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অ্যাগ্রিমেন্ট অন বিডি-ইউএস রিসিপ্রোকাল ট্রেড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা বা সক্ষমতা ধরে রাখাসহ এবং বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বাড়ানো ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে।