অস্কারজয়ী নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান বহুদিন ধরেই আইম্যাক্স পর্দার জন্য সিনেমা নির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন। ওপেনহাইমার, ইনসেপশন ও দ্য ডার্ক নাইট ট্রিলজির এই পরিচালক জানান, শৈশবে শিকাগোর মিউজিয়াম অব সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে প্রকৃতিবিষয়ক তথ্যচিত্র দেখার পর থেকেই তার মধ্যে আইম্যাক্স ফরম্যাটে একটি বড় হলিউড সিনেমা তৈরির আগ্রহ জন্মেছিল।
সেই স্বপ্ন এবার বাস্তবে রূপ নিয়েছে ‘দ্য ওডিসি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এটি বিশ্বের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যা সম্পূর্ণভাবে আইম্যাক্স ফিল্মে ধারণ করা হয়েছে।
আইম্যাক্স চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন মাইলফলক
নোলানের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। আগে আইম্যাক্স ক্যামেরা এতটাই শব্দ করত যে সংলাপনির্ভর দৃশ্য ধারণ করা কঠিন ছিল। তবে ওপেনহাইমার নির্মাণের পর চলচ্চিত্র নির্মাতারা আইম্যাক্সের সঙ্গে যৌথভাবে একটি বিশেষ ক্যামেরা আবরণ বা ব্লিম্প তৈরি করেন, যা ক্যামেরার শব্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
নতুন ক্যামেরা সিস্টেমটির নাম রাখা হয়েছে ‘দ্য কেইগলি’, দীর্ঘদিনের আইম্যাক্স নির্বাহী প্যাট্রিসিয়া ও ডেভিড কেইগলির নাম অনুসারে। ক্যামেরাটি উৎসর্গ করা হয়েছে ডেভিড কেইগলিকে, যিনি দ্য ওডিসিতে নিজের কাজ শেষ করার তিন সপ্তাহ পর মারা যান।
তবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল। আবরণ লাগানোর পর ক্যামেরাটির ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ পাউন্ড। প্রতি আড়াই থেকে তিন মিনিট পরপর ফিল্ম রিল পরিবর্তন করতে হতো। এ ছাড়া বিশাল ক্যামেরার কারণে অভিনয়শিল্পীরা যাতে একে অপরকে দেখতে পারেন, সে জন্য বিশেষ আয়নার ব্যবস্থাও তৈরি করতে হয়েছে।
সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দর্শকদের জন্য ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়াই ছিল লক্ষ্য বলে জানান নোলান।
তিনি বলেন, ‘দর্শকরা সবসময় নতুন ও রোমাঞ্চকর কিছু খোঁজেন। আমরা তাদের সেটাই দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
বিভিন্ন ফরম্যাটে মুক্তি
শুক্রবার (১৭ জুলাই) প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে ‘দ্য ওডিসি’। দর্শকরা সিনেমাটি আইম্যাক্স ৭০ মিমি, স্ট্যান্ডার্ড ৭০ মিমি, ডিজিটাল আইম্যাক্স, ৩৫ মিমি, ডলবি সিনেমা ও অন্যান্য প্রিমিয়াম লার্জ-ফরম্যাট পর্দায় দেখতে পারবেন।
২০২৩ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোলান বলেছিলেন, ‘সিনেমা হলে চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা ঘরে বসে কখনোই পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়। যদি কেউ আইম্যাক্স পর্দায় ছবিটি দেখার সুযোগ পান, সেটি দারুণ হবে। কারণ এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা, যা ঘরে বসে পাওয়া সম্ভব নয়।’
কেন আলাদা আইম্যাক্স ৭০ মিমি
নোলানের আগের ডানকার্ক, টেনেট ও ওপেনহাইমার চলচ্চিত্র বড় ফরম্যাটের ফিল্মে ধারণ করা হয়েছিল। এতে আইম্যাক্স ৬৫ মিমি ও প্যানাভিশন ৬৫ মিমি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়, পরে সেগুলো ৭০ মিমিতে প্রদর্শিত হয়।
নোলানের মতে, আইম্যাক্স ৭০ মিমি অতুলনীয় স্বচ্ছতা, তীক্ষ্ণতা ও গভীরতা প্রদান করে, যা দর্শককে ত্রিমাত্রিক চশমা ছাড়াই ছবির ভেতরে ডুবে থাকার অনুভূতি দেয়। পর্দাটাই যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। বিশাল পর্দা পুরো দৃষ্টিসীমা জুড়ে থাকায় দর্শক আরও বেশি নিমগ্ন থাকেন।
প্রথমবার দ্য ডার্ক নাইট চলচ্চিত্রে আইম্যাক্স ক্যামেরা ব্যবহার করেন নোলান। সিনেমাটির শুরুতে আইম্যাক্স ৭০ মিমিতে ধারণ করা আকাশপথের দৃশ্য প্রদর্শনের সময় দর্শকদের বিস্মিত প্রতিক্রিয়ার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিবারই আমরা দর্শকদের মুখে বিস্ময়ের শব্দ শুনেছি। এমন কিছু আগে কেউ দেখেনি।’
প্রযুক্তিগতভাবে আইম্যাক্স ফিল্ম প্রচলিত ৩৫ মিমি প্রজেক্টরের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি রেজোলিউশন দিতে সক্ষম। প্রতিটি ফ্রেমে প্রায় ১৮ হাজার পিক্সেল থাকে, যেখানে সাধারণ হোম এইচডি ডিসপ্লেতে থাকে মাত্র এক হাজার ৯২০ পিক্সেল।
৬৫ মিমিতে ধারণ, ৭০ মিমিতে প্রদর্শন কেন
নোলান জানান, অতিরিক্ত পাঁচ মিমি জায়গাটি আগে ফিল্ম প্রিন্টে সাউন্ডট্র্যাক সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে ডিজিটাল সাউন্ড ব্যবহারের পরও ঐতিহ্যগত কারণে এই ফরম্যাট বজায় রয়েছে এবং এটি দৃশ্যগত উপস্থাপনাকেও সমৃদ্ধ করে।
ভিন্ন পর্দার জন্য আলাদা পরিকল্পনা
নোলান বলেন, আইম্যাক্সে শুটিং করার সময় বিভিন্ন সিনেমা হলের ভিন্ন ভিন্ন অ্যাসপেক্ট রেশিও বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করতে হয়। এজন্য তার দল ‘সেন্টার পাঞ্চিং দ্য অ্যাকশন’ নামে একটি কৌশল ব্যবহার করে, যাতে সব ধরনের পর্দায় গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যগুলো ঠিকভাবে দেখা যায়।
চিত্রগ্রাহক হইটে ভ্যান হইটেমাও শুটিংয়ের সময় বিভিন্ন পর্দার জন্য ফ্রেমিং পর্যবেক্ষণ করেন। ১.৪৩:১ অনুপাতের বিশাল আইম্যাক্স পর্দায় দর্শক পুরো ফ্রেম দেখতে পান। তবে ৩৫ মিমি, ডিজিটাল ও সিনেমাস্কোপ সংস্করণে ছবির ওপর ও নিচের কিছু অংশ কেটে যায়। তবে নোলানের মতে, এতে চলচ্চিত্রের শৈল্পিক বিন্যাসে কোনো প্রভাব পড়ে না।
নোলানের পছন্দের প্রদর্শন ফরম্যাট
নোলানের মতে, সিনেমা উপভোগের জন্য আইম্যাক্স ৭০ মিমিই সেরা মাধ্যম। তবে এই ফরম্যাটে প্রদর্শনের সুযোগ খুবই সীমিত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় মাত্র ৩২টি প্রেক্ষাগৃহে আইম্যাক্স ৭০ মিমিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়।
স্ট্যান্ডার্ড ৭০ মিমি প্রিন্টেরও প্রশংসা করে তিনি জানান, এটি অসাধারণ উপস্থাপনা। দুই ফরম্যাটই ভিন্ন ধরনের, আর আমি দুটিকেই ভালোবাসি।
ডিজিটাল ফরম্যাটও দিচ্ছে উন্নত অভিজ্ঞতা
বেশিরভাগ দর্শক দ্য ওডিসি দেখবেন ডিজিটাল আইম্যাক্স, লেজার প্রজেকশন ও রিগাল আরপিএক্স, সিনেমার্ক এক্সডি ও সিনেপ্লেক্স আল্ট্রাএভিএক্সের মতো প্রিমিয়াম লার্জ-ফরম্যাট ব্যবস্থায়।
নোলান জানান, মূল আইম্যাক্স ফিল্ম থেকে সর্বোচ্চ মানের ডিজিটাল সংস্করণ তৈরিতে তার দল কয়েক মাস সময় ব্যয় করে, যাতে সব ধরনের পর্দায়ও সর্বোচ্চ ছবির মান নিশ্চিত করা যায়। তিনি আধুনিক লেজার প্রজেক্টর ব্যবহৃত আইম্যাক্স ও ডলবি সিনেমা হলগুলোর ছবির মান ও কনট্রাস্টেরও প্রশংসা করেন।
নোলানের মতে, গত দুই থেকে তিন দশকে আইম্যাক্সের প্রভাবের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহ ছবি ও শব্দের মান উন্নত করেছে, যার সুফল পাচ্ছেন নির্মাতা ও দর্শক উভয়ই।
কোথায় বসে সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন নোলান
নোলানের মতে, আসন নির্বাচন প্রেক্ষাগৃহের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হওয়া উচিত। সিনেমাস্কোপ পর্দার ক্ষেত্রে তিনি সামনের দিকে, তৃতীয় সারির মাঝামাঝি বসতে পছন্দ করেন।
অন্যদিকে, ১.৪৩:১ অনুপাতের বড় আইম্যাক্স প্রেক্ষাগৃহে তিনি অডিটোরিয়ামের মাঝামাঝি অংশের সামান্য পেছনের আসনে বসার পরামর্শ দেন, যাতে পুরো পর্দা সবচেয়ে ভালোভাবে উপভোগ করা যায়।