সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে দুধসাদা রঙের এক বিরল মহিষ। তার নাম রাখা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। বিশাল আকৃতি, অস্বাভাবিক সাদা গায়ের রঙ আর লালচে চোখের কারণে মহিষটি ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ বলছেন এটি সৌভাগ্যের প্রতীক, কেউ আবার একে প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল বলে বর্ণনা করছেন। কিন্তু এই সাদা রঙের রহস্য কী? কেন এমন হয়? আর শুধু প্রাণী নয়, মানুষের মধ্যেও কি এমন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে অ্যালবিনো নামের এক বিরল জৈবিক বৈশিষ্ট্যে। বাংলায় একে বলা যায় জন্মগত রঙহীনতা। সাধারণত প্রাণী বা মানুষের শরীরে যে রঞ্জক পদার্থ ত্বক, চুল কিংবা চোখের রঙ তৈরি করে, সেটিকে বলা হয় মেলানিন। কোনো কারণে শরীরে এই রঞ্জক তৈরি না হলে বা খুব কম তৈরি হলে জন্ম নেয় অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য। তখন গায়ের রঙ অস্বাভাবিক সাদা হয়ে যায়, চুল হয় ফ্যাকাশে, চোখে দেখা দেয় লালচে বা হালকা গোলাপি আভা।
অ্যালবিনো শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ আলবাস থেকে, যার অর্থ সাদা। সাধারণভাবে অ্যালবিনো বলতে এমন মানুষ বা প্রাণীকে বোঝায়, যাদের শরীরে স্বাভাবিক রঙ তৈরির উপাদান খুব কম থাকে বা একেবারেই থাকে না। এই কারণে তাদের ত্বক, চুল, পশম বা পালক অস্বাভাবিক সাদা বা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। অনেক সময় চোখও লালচে বা হালকা গোলাপি দেখায়। বাংলায় একে জন্মগত রঙহীনতা বা বর্ণহীনতা বলা যেতে পারে।
এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয়; মূলত বংশগত জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এমনটা ঘটে। মানুষ, মহিষ, বাঘ, হরিণ, সাপ, পাখি অনেক প্রাণীর মধ্যেই অ্যালবিনো প্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
বিশ্বজুড়ে অ্যালবিনো প্রাণী সবসময়ই মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্র। সাদা বাঘ, সাদা হরিণ, সাদা কাক কিংবা সাদা সাপ নিয়ে নানা লোককথা ও রহস্য বহু পুরোনো। আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে অ্যালবিনো প্রাণীকে দেবতার আশীর্বাদ মনে করা হয়। আবার কোথাও এগুলোকে অশুভ বলেও ধরা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতিতে অ্যালবিনো প্রাণীর টিকে থাকা বেশ কঠিন। কারণ স্বাভাবিক রঙ না থাকায় তারা সহজেই শিকারিদের চোখে পড়ে যায়। অনেকের দৃষ্টিশক্তিও দুর্বল হয়। ফলে বনে-জঙ্গলে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়।
সাদা মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়েও তাই এত আলোচনা। কৃষি ও প্রাণিবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মহিষের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত বিরল। অনেক সময় আংশিক রঙহীনতা দেখা যায়, কিন্তু পুরো শরীর সাদা হয়ে যাওয়া খুব কম ঘটে। আর বিরল কিছু দেখলেই মানুষ সেটিকে ঘিরে গল্প বানাতে শুরু করে। সামাজিক মাধ্যমে কেউ বলছেন মহিষটি কোটি টাকার, কেউ দাবি করছেন এটি সৌভাগ্য এনে দেয়। বাস্তবে অবশ্য এটি একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য ছাড়া অন্য কিছু নয়।
তবে অ্যালবিনো শুধু প্রাণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জন্মগত রঙহীনতা নিয়ে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করছেন। তাদের ত্বক অত্যন্ত ফর্সা, চুল সাদা বা হালকা হলুদ এবং চোখে থাকে আলাদা ধরনের সংবেদনশীলতা। রোদে বের হলে সহজেই ত্বক পুড়ে যায়। অনেকের চোখে কম দেখা, আলো সহ্য করতে না পারা কিংবা দৃষ্টিজনিত সমস্যা থাকে।
আফ্রিকার কিছু দেশে অ্যালবিনো মানুষদের জীবন এখনো ভয়াবহ কুসংস্কারের মধ্যে বন্দি। বিশেষ করে তানজানিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করা হয়, অ্যালবিনো মানুষের শরীরের অংশ নাকি জাদুবিদ্যায় সৌভাগ্য এনে দেয়। এই ভয়ংকর বিশ্বাসের কারণে বহু মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জাতিসংঘ পর্যন্ত এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপ বা আমেরিকার দেশগুলোতে অ্যালবিনো ব্যক্তিদের নিয়ে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। এখন তারা ফ্যাশন, শিল্প কিংবা গণমাধ্যমেও পরিচিত মুখ হয়ে উঠছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালবিনো কোনো রোগ নয়; এটি মূলত বংশগত বৈশিষ্ট্য। বাবা-মায়ের শরীরে নির্দিষ্ট ধরনের জিন থাকলে সন্তানের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা দিতে পারে। অনেক সময় পরিবারের কারও মধ্যে আগে কখনো এমন লক্ষণ না থাকলেও নতুন প্রজন্মে হঠাৎ দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি বিরল হলেও অস্বাভাবিক নয়।
মজার বিষয় হলো, ইতিহাসজুড়েও অ্যালবিনো মানুষ ও প্রাণী নিয়ে মানুষের আকর্ষণ ছিল প্রবল। প্রাচীন রাজারা সাদা হাতি বা সাদা প্রাণীকে রাজকীয় প্রতীক হিসেবে রাখতেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে সাদা হাতিকে এখনো পবিত্র মনে করা হয়। কারণ প্রকৃতিতে যা বিরল, মানুষ সেটিকেই রহস্যময় মর্যাদা দিতে ভালোবাসে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের সাদা মহিষটিও সেই পুরোনো মানবিক বিস্ময়েরই নতুন সংস্করণ।
তবে বিজ্ঞানীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অ্যালবিনো প্রাণী বা মানুষকে অলৌকিক কিছু ভাবার সুযোগ নেই। তাদের শরীর প্রকৃতিরই অংশ। বরং এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা অনেক বেশি যত্নের প্রয়োজন অনুভব করে। অতিরিক্ত রোদ, চোখের সমস্যা কিংবা শারীরিক দুর্বলতার কারণে তাদের বিশেষ সুরক্ষা দরকার হয়।
সাদা মহিষটিকে ঘিরে মানুষের উন্মাদনা হয়তো কিছুদিন পর কমে যাবে। সামাজিক মাধ্যম নতুন কোনো আলোচনায় মেতে উঠবে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের সেই মহিষ আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতি এখনো কত অদ্ভুত, কত রহস্যে ভরা। মানুষের চোখে যা বিস্ময়, বিজ্ঞানের কাছে তা এক জিনগত খেলা ছাড়া আর কিছু নয়। আর সেই খেলাই কখনো জন্ম দেয় দুধসাদা এক মহিষের, কখনো বা এমন এক মানুষের, যার শরীরে রঙ নেই, তবু আছে আলাদা এক সৌন্দর্য, আলাদা এক গল্প। যে গল্প দেশ ছাড়িয়ে সুদূর আমেরিকা অবধি পৌঁছে যায়!