ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের মেঝেতে শুয়ে বিলাপ করছিলেন কনিকা আক্তার। আল্লাহর কাছে করুণা চাইছিলেন তিনি। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার স্বামী মোহাম্মদ জাকির। শোকে মুহ্যমান জাকির বারবার নিজের বুক চাপড়াতে চাপড়াতে হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা ছয় মাস বয়সী মেয়ে রুহির দিকে ইঙ্গিত করে বলছিলেন, ‘ওর মতো দেখতে একটা মেয়েকে আমি কীভাবে কবর দেব?’
সেদিনই হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় রুহির জমজ বোন রিসা। আর এই মৃত্যুর পরপরই রুহিকে স্থানান্তর করা হয় সেই একই আইসিইউ শয্যায়, যেখানে কিছুক্ষণ আগেই তার বোনের মৃত্যু হয়েছিল।
বাংলাদেশ বর্তমানে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ৩২ হাজারের বেশি হাম উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে ও মারা গেছে অন্তত আড়াইশো। মৃতদের বেশিরভাগই শিশু। এই পরিস্থিতিতে দেশের হাসপাতালগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শিশু রোগীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। অনেক শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগছে, কেউ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
এক সময় গবেষকরা মনে করেছিলেন হাম নির্মূল করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আবারও ফিরে আসছে এই রোগ। কানাডা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে নিজেদের ‘হামমুক্ত’ বলে ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৭০০ জনের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে, যেখানে ২০০০ সালের শুরুর দিকে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১০০-এর কাছাকাছি। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে টিকা গ্রহণে অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি হামের পুনরুত্থানের বড় কারণ। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশ দীর্ঘদিন ধরেই টিকাদান কর্মসূচির কারণে গর্ব করত। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভাঙন তৈরি হয়।
বাংলাদেশে সাধারণত শিশুদের নয়মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতি চার বছর পর একটি জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়, যাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা যায়।
বহু বছর ধরে ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করত এবং এর বড় অংশের অর্থায়ন করত গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স। সরকারও এতে অর্থায়ন করত। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে।
এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ইউনিসেফ। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, তিনি বারবার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন। তার ভাষায়, ‘অনুগ্রহ করে এটা করবেন না। এতে টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।’
কিন্তু নতুন দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। ফলে দেশজুড়ে টিকার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্থগিত হওয়া সম্পূরক এমআর টিকাদান কার্যক্রম ২০২৫ সালেও বাতিল করা হয়। মার্চের শেষ দিকে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। পরে সেই তথ্য সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে প্রথম হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। পরে দ্রুত তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
এখন পর্যন্ত ২১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার ও ভারতে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টিও মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির ও ১০ শতাংশ শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। এ ছাড়া ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিও শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের পর থেকে তিনটি জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনও বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী এএসএম আলমগীর। স্বল্প অর্থায়ন ও সীমিত সক্ষমতার হাসপাতালগুলো এই সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে।
এদিকে ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। এপ্রিলে আবারও ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু করা হয়েছে। গত ৫ এপ্রিল উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ছয়মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে ২০ এপ্রিল তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয়।
সরকার জানিয়েছে, খুব শিগগিরই ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ কার্যক্রমও পুনরায় শুরু হবে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বর্তমানে যেভাবে হাম ছড়িয়ে পড়ছে তাতে শুধু জরুরি টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে না। রোগ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘এই গতিতে টিকাদান চললে এখনই সংক্রমণ কমবে না।’
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন সরকারকে দ্রুত জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘এটি ইতোমধ্যেই জরুরি অবস্থা। তাহলে সরকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে দ্বিধা করছে কেন?’
এ ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে দোষারোপ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বক্তব্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার, উভয়কেই দায়ী করেছেন। অন্যদিকে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তার সরকারের আমলে টিকাদান কার্যক্রম অগ্রাধিকার পেয়েছিল এবং বড় ধরনের হাম প্রাদুর্ভাব দেখা যায়নি।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা ক্রয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, একটি দেশের টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কত দ্রুত জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
সূত্র: বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্স