পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট-১-এ আগামী ৭ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং শুরু হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, রুশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সময়সূচি সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউনিট-১-এর সব প্রস্তুতিমূলক কাজ আগামী ২৭ মার্চের মধ্যে শেষ হবে। এরপর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কমিশনিং করবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন শনিবার (১৪ মার্চ) গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রুশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান গত সপ্তাহে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ইউনিট-১-এ আগামী ৭ এপ্রিল থেকে জ্বালানি লোডিং শুরু হবে। আশা করা যায়, জুলাইয়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু করে জাতীয় গ্রিডে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যদি এই সময়সূচি ধরে এগোয়, তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে ইউনিটটি পূর্ণ এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সফরের সময় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিদর্শনসহ সব কাজ ২৭ মার্চের মধ্যে শেষ করা হবে। প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হলে ইউনিট-১ জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স পাবে।’
এর আগে গত ৮ মার্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা রূপপুর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং সন্তোষ প্রকাশ করেন। সরকারি সফরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সংশ্লিষ্টদের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রোটোকল কঠোরভাবে মেনে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই কেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।’
এদিকে প্রকল্প ও নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউনিট-১ দ্রুত চালু করতে তারা ২৪ ঘণ্টা কাজ করছেন। এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে প্রায় দুই হাজার পরীক্ষা সম্পন্ন করেছি। এর ওপর ভিত্তি করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য পরিদর্শন চলছে। গত সপ্তাহ পর্যন্ত এক হাজার ৬৫০টি পরিদর্শন শেষ হয়েছে এবং আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, পরিদর্শনে ছোটখাটো কিছু ত্রুটি ধরা পড়লেও বড় সমস্যা পাওয়া যায়নি। ছোটখাট যেসব সমস্যা পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো সঙ্গে সঙ্গেই সমাধান করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি (বিএইআরএ) পরিদর্শন প্রক্রিয়াটি তদারকি করছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের ঠিক আগে কমিশনিং লাইসেন্স দেওয়া হবে।
সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে জুলাইয়ের মধ্যে ইউনিটটির মোট সক্ষমতার ৩০ শতাংশ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনে পৌঁছানো সম্ভব হবে।’
অন্যদিকে ইউনিট-২ এক বছর পর চালু হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দুটি ইউনিট থেকে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে ইউনিট-১-এর কমিশনিং চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ইউনিট-২-এর কাজ ৭০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকে দুটি ভিভিইআর-১২০০ মডেলের রিঅ্যাক্টরসমৃদ্ধ ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের মোট খরচের ৮১ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পটির কমিশনিং ২০২২ সালে হওয়ার কথা থাকলেও সব মিলিয়ে তিন বছর দেরি হলো। একই সঙ্গে গত বছর বাংলাদেশ ও রাশিয়া উভয় ইউনিটের কাজ শেষ করতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়।