আজ মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২০ সালের এই দিনে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার এবং মা সায়েরা খাতুন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। পরবর্তী সময়ে ‘খোকা’ নামের এই শিশুটিই হয়ে ওঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির ত্রাতা ও মুক্তির দিশারি।
গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার পর থেকেই শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবনের অভিযাত্রা। পরে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের মতো প্রখ্যাত নেতাদের সান্নিধ্যে এসে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর তিনি ঢাকায় ফিরে নতুন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৯৪৮ সালে সহকর্মীদের নিয়ে ছাত্রলীগ গঠন করেন এবং ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে কারাগারে থাকাবস্থায় তিনি যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।
বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হলেও তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। এর প্রেক্ষাপটে তার নেতৃত্বে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভাষণে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সেই ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের জন্য জনগণকে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি কারামুক্ত হয়ে দেশে ফিরে তিনি প্রথমেই যান রেসকোর্স ময়দানে। সেখানে লাখো মানুষের সামনে তিনি তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশের কথা তুলে ধরেন। এরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। তবে তিনি বেশি দিন দেশ গঠনের কাজ চালিয়ে যেতে পারেননি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় সেনাসদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন তিনি। তারপর থেকে নানা সময়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন আয়োজন হতো নানাভাবে। বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে তার জন্মদিন উদযাপন হতো ঘটা করে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। দুই বছর ধরে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই কাটে দিবসটি। তবে আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ এবং ই-মেইলে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।