শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাঙালিকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করেছিল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার সেই ঘোষণা দেশের মানুষকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেছিল। এই ভাষণই বাংলাদেশের ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের শুরুর পথ সুগম করেছিল।
তিনি ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কলেজ পর্যন্ত পড়াশোনার সময় শেখ মুজিব নেতৃত্বের প্রতিভা প্রমাণ করেন। ১৯৪৩ সালে বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং ১৯৪৪ সালে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র লীগের সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৪৭ সালে ভারত-বাংলাদেশ বিভাজনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন, যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করায় তার সেই পড়া শেষ হয়নি। এরপর ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ভাষা আন্দোলন ও সামাজিক ন্যায়ের জন্য বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন এবং বহুবার কারাভোগও করেন।
১৯৪৯ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয় সামলান। ১৯৫৫ সালে সর্বসম্মতিক্রমে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। শেখ মুজিব তখন দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন ঘোষিত হওয়ায় কয়েক বছর কারাবন্দি থাকেন। ১৯৬১ সালে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন, ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেন।
১৯৬৬ সালে লাহোরে ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করে পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হন, যা প্রত্যাহারের দাবিতে দেশব্যাপী গণ আন্দোলন ছড়ায়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পল্টনে জনসভায় তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়, যা জনগণের কাছে তার অনন্য গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের দলকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয় না। পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাধার মধ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দেন। পরে ১৯৭২ সালে পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে যান। অল্পদিনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি থাকার পর প্রধানমন্ত্রী হন। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠা ও আমৃত্যু রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ করেন। সেই বছর ১৫ আগস্ট রাতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলেন, শেখ মুজিব সাহসী, দৃঢ়চেতা ও আপোসহীন নেতা ছিলেন। জনগণের ভাষা বুঝতেন, তাদের সঙ্গে মিশতে পারতেন এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি তাকে বাংলাদেশের জনগণের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্থাপন করেছিল।
২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি শ্রোতা জরিপে আয়োজন করে। বিষয় ছিলো—সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? ৩০ দিনের ওপর চালানো জরিপে শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ২০জনের জীবন নিয়ে বিবিসি বাংলায় বেতার অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় সেই বছরের ২৬ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত। সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনয়নে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হন শেখ মুজিবুর রহমান।
শ্রোতারা বলেন, তার ৭ মার্চের সেই ভাষণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাঙালিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন ও লড়াইয়ের পথে পরিচালিত করেছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি একত্র হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয়।