জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করলেও আইনি জটিলতার কারণে এখনো চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ করতে পারছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন, বিশেষ করে আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২) সংশোধনীসহ একাধিক অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে পাসের অপেক্ষায় থাকায় কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে শুরু করার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সর্বশেষে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের চিন্তা ভাবনা চলছে। তবে আইনগত কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় এখনো পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি।
আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই ধারাবাহিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পথে এগোবে ইসি। তবে নির্বাচন একসঙ্গে নাকি ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে—সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে, নাকি সাধারণ প্রতীকে—এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো নির্ধারিত হয়নি। এছাড়া সরকারের প্রস্তাবিত কিছু পরিবর্তন সংসদে অনুমোদন পাবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত। ফলে নির্বাচন আয়োজনের কৌশলগত দিক নির্ধারণে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ইসিকে।
ইসি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্চ মাসে প্রশাসক নিয়োগের সময় থেকে ছয় মাস হিসাব করলে আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সরকার দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করতে আগ্রহী হলেও কিছু আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরের নির্বাচন বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে সাধারণ প্রতীকে নির্বাচনের প্রস্তাবও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অধ্যাদেশগুলো বর্তমানে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটিতে রয়েছে। সেগুলো পাস হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ভোটিং শেষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এলে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হবে। তবে পাঁচটি স্তরের নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন সম্ভব নয়। ব্যয়, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং প্রস্তুতির বিষয় বিবেচনায় ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় আইন পাস হলেই ইসি কার্যক্রম শুরু করবে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার থেকে আনুষ্ঠানিক চাহিদা এলে আমরা সেই অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেব।’
ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার পরই কমিশন প্রস্তুতি শুরু করে। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচন সূচি, মেয়াদ এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক বিষয় নির্ধারণ করা হয়। এখন পর্যন্ত তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে। তাদের কেউ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন, আবার কেউ দলীয় মনোনয়ন পাননি—ফলে এই নিয়োগকে অনেকে ‘পুনর্বাসন’ হিসেবেও দেখছেন।
এছাড়া অধিকাংশ উপজেলা পরিষদ এবং প্রায় দেড় হাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অনুপস্থিত বা পলাতক থাকায় সেখানেও প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠান প্রশাসকদের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত নির্বাচনের দিকে এগোতে চায় সরকার ও নির্বাচন কমিশন।
ইসি সূত্র বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্যও আগাম বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী সামগ্রী ক্রয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ছোট হোসিয়ান ও গানিব্যাগ প্রতিটি এক লাখ ১৫ হাজার পিস, বড় হোসিয়ান ব্যাগ ৭৫ হাজার পিস, মার্কিং সিল ১৭ লাখ ৫০ হাজার পিস এবং অফিসিয়াল সিল ৮ লাখ ৪০ হাজার পিসসহ অন্যান্য সামগ্রী রয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহে দীর্ঘ সময় লাগে বলে আগেই এসব কেনা হয়েছে, যাতে সংসদ নির্বাচনের পর দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করা সম্ভব হয়।