ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই পশ্চিম এশিয়ায় নতুন এক সামরিক জোট গঠনের আলোচনা জোরালো হচ্ছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারকে ঘিরে সম্ভাব্য এই প্রতিরক্ষা কাঠামোকে অনেক বিশ্লেষক ইসলামিক ন্যাটো হিসেবে অভিহিত করছেন। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো জোট ঘোষণা করা হয়নি, তবুও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে তুরস্ক ও কাতার যোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা অনেকটা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তার ভাষায়, এই জোট শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নতুন করে নিজেদের নিরাপত্তা জোট ও কৌশল নির্ধারণ করছে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলো মনে করছে, আঞ্চলিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র সবসময় প্রত্যাশিত নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে আলাদা প্রতিরক্ষা সমন্বয়ের আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই সম্ভাব্য জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে চার দেশের আলাদা শক্তিকে। পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক সক্ষমতা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি। তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্রোন প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও কাতারের হাতে রয়েছে বিশাল জ্বালানি সম্পদ ও আর্থিক শক্তি। এই চারটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক শক্তি ভারসাম্য তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালে পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তিতে বলা হয়, যেকোনো এক দেশ তৃতীয় পক্ষের হামলার শিকার হলে সেটিকে উভয় দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পরবর্তীতে এই সমঝোতাকে আরও বিস্তৃত করার আলোচনা শুরু হয়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সৌদি আরবে প্রায় আট হাজার সেনা, জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, ড্রোন ইউনিট ও চীনা এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে ৮০ হাজার পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের সুযোগ রয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য এই জোট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ভারত ও ইসরায়েলে। ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এবং সৌদি আরবের আর্থিক শক্তি একসঙ্গে কাজ করলে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই জোট নয়াদিল্লির জন্য নতুন কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই জোট বাস্তবে কতদূর এগোবে, তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ সম্ভাব্য চারটি দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্ক আবার ন্যাটোর সদস্য। ফলে পশ্চিমাবিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে আংকারা কতদূর যাবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে পাকিস্তানের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা। একদিকে তারা ইরান যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ইসলামিক ন্যাটো এখনো আনুষ্ঠানিক বাস্তবতা না হলেও এটি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে গিয়ে মুসলিম দেশগুলোর নিজস্ব প্রতিরক্ষা বলয় তৈরির আলোচনা ভবিষ্যতে আরও জোরালো হতে পারে। তবে সেটি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে রূপ নেবে, নাকি কৌশলগত সমন্বয় হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: রয়টার্স, এনডিটিভি, দ্য ইকোনোমিক টাইমস